ভাবুন তো, মানুষের মতো দেখতে রোবটরা দৌড়াচ্ছে, ফুটবল খেলছে, এমনকি একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ধপাস করে পড়ে যাচ্ছে! শুনতে অবাক লাগলেও, এমনই এক অভাবনীয় দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে চিনের রাজধানী বেইজিং। সম্প্রতি এখানেই অনুষ্ঠিত হলো বিশ্বের প্রথম হিউম্যানয়েড রোবট গেমস, যেখানে রোবটরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মানুষের মতো খেলাধুলায় অংশ নিয়েছে।
এই ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল ১৬টি দেশের ২৮০টি দলের ৫০০-এরও বেশি রোবট। গত ১৫ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত তিন দিন ধরে চলা এই গেমসের আয়োজন করা হয়েছিল বেইজিংয়ের ন্যাশনাল স্পিড স্কেটিং ওভাল-এ, যেটি ২০২২ সালের শীতকালীন অলিম্পিক-এর জন্য তৈরি করা হয়েছিল। চিনের সরকার এই ইভেন্টের মাধ্যমে সারা বিশ্বকে তাদের রোবট প্রযুক্তির অত্যাধুনিক অগ্রগতি দেখাতে চেয়েছিল। টিকিটের দাম ছিল ১২৮ থেকে ৫৮০ ইউয়ান, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৫০০ থেকে ৭০০০ টাকা।
খেলার মাঠের কিছু মজার মুহূর্ত:
১. দৌড় প্রতিযোগিতা: মানুষের মতো রোবটরাও ১০০ মিটার, ৪০০ মিটার এবং ১৫০০ মিটার দৌড়ে অংশ নিয়েছিল। সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল, দৌড়াতে গিয়ে রোবটদের বারবার পড়ে যাওয়া। একটি রোবট তো দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ ধপাস করে পড়ে গেল, আর তার মাথাটা খসে পড়ল! অন্যদিকে, একটি রোবট ১৫০০ মিটার দৌড় শেষ করেছে ৬ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে, যা মানুষের বিশ্বরেকর্ডের (৩ মিনিট ২৬ সেকেন্ড) তুলনায় অনেক পিছিয়ে। তবে, এই দৌড় প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ইউনিট্রি সংস্থা-র তৈরি H1 রোবট, যা ৪০০ মিটার এবং ১৫০০ মিটার উভয় বিভাগেই সোনা জিতেছে।
২. ফুটবল ম্যাচ: এই খেলায় রোবটরা ৫-এ-সাইড বা ৩-এ-সাইড দল হিসেবে খেলেছে। রোবটরা বল নিয়ে ছুটতে গিয়ে প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। এমনকি, চারটি রোবট একসঙ্গে জট পাকিয়ে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে দর্শকরা হাসিতে ফেটে পড়েন। মজার বিষয়, কিছু রোবট নিজেরাই উঠে দাঁড়াতে পারছিল, যা দেখে দর্শকরা হাততালি দিয়ে তাদের উৎসাহ দেন। জার্মানির একটি দলের ম্যানেজার বলেন, চিনের রোবটরা খুবই উন্নত এবং দক্ষ।
৩. অন্যান্য ইভেন্ট: শুধু দৌড় আর ফুটবল নয়, রোবটরা টেবিল টেনিস, নাচ, কুংফু, কিকবক্সিং এবং জিমন্যাস্টিকস-এর মতো নানা ইভেন্টেও অংশ নিয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তারা হিপ-হপ নাচ থেকে শুরু করে ফ্যাশন শো পর্যন্ত করেছে। খেলার মাঠে গোল করার পর একটি রোবটকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেও দেখা যায়, যদিও অনেক সময় তারা ব্যর্থও হয়েছে। এছাড়াও, এই গেমসে রোবটদের দিয়ে ওষুধ সাজানো, জিনিসপত্র পরিষ্কার করার মতো দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজও করানো হয়।
এই প্রতিযোগিতায় মূলত চিনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় (সিংহুয়া, পেকিং) এবং সংস্থা (ইউনিট্রি, বুস্টার রোবটিক্স) থেকে আসা দলগুলো অংশ নেয়। পাশাপাশি, জার্মানি, আমেরিকা এবং ব্রাজিলের মতো দেশ থেকেও দল এসেছিল। আয়োজকদের মতে, এই প্রতিযোগিতা রোবটদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, চলাফেরা এবং নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যাচাই করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
চিনের লক্ষ্য:
জনসংখ্যার সমস্যা এবং আমেরিকার সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে চিন রোবট প্রযুক্তিতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। তারা ২০২৭ সাল-এর মধ্যে বিশ্বের সেরা হিউম্যানয়েড রোবট শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে। এর আগে গত এপ্রিল মাসে হিউম্যানয়েড রোবট ম্যারাথন এবং মে মাসে কিকবক্সিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোবটরা এখনও মানুষের মতো নিখুঁত না হলেও, চিন এই ক্ষেত্রে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।