ভারতের মহাকাশ ইতিহাসে আরেকটি সোনালি অধ্যায় যুক্ত হতে চলেছে। দীর্ঘ ৪১ বছরের অপেক্ষার পর, ১৯৮৪ সালে উইং কমান্ডার রাকেশ শর্মার পর এবার মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছেন ভারতীয় বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা। তিনি শুধু মহাকাশে যাচ্ছেন না, বরং প্রথম ভারতীয় হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS)-এ পা রাখতে চলেছেন। ২৫ জুন ২০২৫, বুধবার, ভারতীয় সময় দুপুর ১২:০১ থেকে শুরু হবে তাঁর এই ঐতিহাসিক যাত্রা। এই যাত্রা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং সমগ্র ভারতের গর্বের মুহূর্ত।
এক যাত্রা, অসংখ্য বাধা
শুভাংশু শুক্লার এই মহাকাশ যাত্রা সহজ ছিল না। এই মিশনের জন্য তিনি ৪০ দিনের কঠিন কোয়ারেন্টাইন এবং প্রশিক্ষণ পর্ব সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। এর আগে, ২৯ মে, ৮ জুন, ১০ জুন, ১১ জুন, ১৯ জুন, এবং ২২ জুন—এই ছয়টি নির্ধারিত তারিখে যাত্রা বাতিল হয়েছিল। ফ্যালকন-৯ রকেটে জ্বালানি লিক এবং ISS এর রাশিয়ান সেকশনে প্রযুক্তিগত ত্রুটির মতো সমস্যার কারণে বারবার পিছিয়ে যায় এই Axiom Mission-4 মিশন। কিন্তু শুভাংশু হাল ছাড়েননি।
Axiom Mission-4: যাত্রার বিস্তারিত
শুভাংশু শুক্লা Axiom Mission-4 (AX-4) মিশনের মাধ্যমে NASAর কেনেডি স্পেস সেন্টার, ফ্লোরিডার লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯এ থেকে SpaceXএর Falcon-9 রকেটে চড়ে Crew Dragon (C213) মহাকাশযানে করে ISSএর উদ্দেশে রওনা দেবেন। উৎক্ষেপণ হবে ২৫ জুন, দুপুর ১২:০১ (IST) এ, এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৬ জুন, বিকেল ৪:৩০ নাগাদ মহাকাশ স্টেশনে ডক করবে। এই যাত্রায় প্রায় ২৮ ঘণ্টা সময় লাগবে।
SpaceX জানিয়েছে, উৎক্ষেপণের জন্য আবহাওয়া ৯০% অনুকূল, এবং সমস্ত প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা প্রস্তুত। এই মিশনটি NASA, Axiom Space, এবং SpaceXএর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে।
শুভাংশু শুক্লা: ভারতের গর্ব
৪০ বছর বয়সী শুভাংশু শুক্লা ভারতীয় বায়ুসেনার একজন অভিজ্ঞ পাইলট। তিনি মিগ-২১ এবং জাগুয়ার ফাইটার জেটে ২,০০০ ঘণ্টার বেশি সময় উড়েছেন। ২০১৯ সালে ISROর গগনযান মিশনের জন্য নির্বাচিত হয়ে তিনি রাশিয়ার ইউরি গ্যাগারিন কসমোনট ট্রেনিং সেন্টারএ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাঁর এই যাত্রা শুধু একটি মহাকাশ অভিযান নয়, বরং ভারতের মহাকাশ প্রযুক্তির স্বনির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি উজ্জ্বল প্রতীক।
শুভাংশু ISSএ ১৪ দিন কাটাবেন এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অংশ নেবেন। তাঁর গবেষণার মধ্যে রয়েছে:
- মেথি ও মুগ বীজের উপর মহাকাশের মাইক্রোগ্র্যাভিটির প্রভাব বিশ্লেষণ।
- মানবদেহে মাইক্রোগ্র্যাভিটির প্রভাব নিয়ে গবেষণা।
- NASAর সঙ্গে যৌথভাবে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা।
এছাড়াও, ISRO এবং DRDO তাঁর জন্য মুগ ডালের হালুয়া এবং আমের জুস পাঠাচ্ছে, যাতে মহাকাশেও ভারতীয় খাবারের স্বাদ থাকে।
ভারতের বিনিয়োগ ও গগনযানের ভবিষ্যৎ
এই মিশনে ভারতের খরচ প্রায় ৫৪৮ কোটি টাকা। AX-4 মিশনের অভিজ্ঞতা ISROর গগনযান প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। এই মিশন ভারতের স্বনির্ভর মহাকাশ প্রযুক্তির একটি বড় পদক্ষেপ এবং ভারত-NASA সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
১৯৮৪ সালে রাকেশ শর্মা সোভিয়েত ইউনিয়নএর সয়ুজ T-11 মহাকাশযানে চড়ে মহাকাশে গিয়ে ভারতের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। চার দশক পর, শুভাংশু শুক্লা তাঁর পথ ধরে এগিয়ে চলেছেন। তিনি ISSএ পা রাখলে ভারতের মহাকাশ ইতিহাসে আরেকটি মাইলফলক তৈরি হবে।
এই মুহূর্তে ১৪০ কোটি ভারতবাসী উৎসাহে মুখর। শুভাংশু শুক্লার এই যাত্রা কেবল একটি মিশন নয়, এটি ভারতের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার প্রতীক। তাই, টিভির সামনে বসে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে প্রস্তুত হয়ে যান।