ভারতের প্রযুক্তিগত ইতিহাসে এক সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হলো, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীর সামনে তুলে ধরলেন দেশের প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় মাইক্রোচিপ, যার নাম ‘বিক্রম ৩২–বিট প্রো’। এই অভাবনীয় সাফল্যের ঘোষণাটি এসেছে ‘সেমিকন ইন্ডিয়া ২০২৫’-এর উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে, যা দেশের প্রযুক্তি এবং স্বনির্ভরতার যাত্রাপথে একটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এবং দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, যা এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
‘বিক্রম’ নামটি ভারতের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং এই চিপটিও তৈরি হয়েছে সেই একই প্রতিষ্ঠান – ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো)-এর সেমিকন্ডাক্টর ল্যাবরেটরিতে। এটি শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, বরং এটি ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নীতির এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। এই চিপটি হলো একটি ৩২–বিট মাইক্রোপ্রসেসর, যা সাধারণ ভাষায় বলা যায় আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ‘মস্তিষ্ক’। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে কম্পিউটার, গাড়ি, এবং বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম – এই ধরনের চিপ ছাড়া কোনো কিছুই সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এটি ডেটা প্রক্রিয়াকরণ, তথ্য সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং যোগাযোগের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অত্যন্ত দ্রুত এবং দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করে।
প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর ভাষণে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন, “ভারতে নিজস্ব মেড ইন ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর চিপের বাণিজ্যিক উৎপাদন এই বছর থেকেই শুরু হবে।” এটি কেবল একটি চিপের উৎপাদন নয়, বরং এটি ভারতের জন্য একটি নতুন শিল্প বিপ্লবের সূচনা। এর ফলে ভারত আর বিদেশি চিপের উপর নির্ভরশীল থাকবে না, বরং নিজেদের চাহিদা পূরণ করে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই উন্নত প্রযুক্তি রপ্তানি করতে পারবে।
‘সেমিকন ইন্ডিয়া ২০২৫’ সম্মেলনটির প্রধান লক্ষ্য হলো সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব, অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গবেষণা এবং বিনিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে দেশের প্রযুক্তিবিদ এবং শিল্পপতিদের মধ্যে গভীর আলোচনা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতীয় চিপ শিল্প বিশ্ববাজারে নিজেদের জন্য একটি সম্মানজনক স্থান করে নিতে সক্ষম হবে। প্রধানমন্ত্রী মোদি আরও জানান, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার-এর বিশাল বাজার ছাড়িয়ে যাবে এবং ভারত এই যাত্রায় একটি বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এই সম্মেলনের চতুর্থ সংস্করণ এটি। এর আগে ২০২২ সালে বেঙ্গালুরুতে, ২০২৩ সালে গান্ধীনগরে এবং ২০২৪ সালে নয়ডায় এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে ‘বিক্রম’ চিপের একটি ছবি শেয়ার করে এই ঐতিহাসিক সাফল্যের কথা তুলে ধরেছেন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছে।
এই ঘটনাটি ভারতের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। ‘বিক্রম’-এর মতো দেশীয় চিপের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে ভারত বিশ্বের প্রযুক্তি মানচিত্রে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করবে।