আরও মারাত্মক ও উন্নত BrahMos-NG আনছে ভারত, ছোট কিন্তু অনেক বেশি শক্তিশালী

Next-Generation BrahMos Development

দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে চলেছে ভারত। সম্প্রতি ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (DRDO)-এর চেয়ারম্যান ড. সমীর ভি. কামাত পুনের ডিফেন্স ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড টেকনোলজি (DIAT)-এর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এক যুগান্তকারী ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ভারত তার নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি BrahMos ক্ষেপণাস্ত্রের একটি নতুন এবং আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করছে, যার নাম BrahMos-NG (Next Generation)। এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্রটি আকারে ছোট, ওজনে হালকা এবং অনেক বেশি বহুমুখী। এটি বর্তমান BrahMos সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাগুলিকে দূর করবে এবং ভারতের সামরিক শক্তিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।

বর্তমান BrahMos-এর সীমাবদ্ধতা:

বর্তমানে যে BrahMos ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়, সেটি খুবই শক্তিশালী হলেও এর কিছু ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু প্ল্যাটফর্ম থেকে লঞ্চ করা যায়। যেমন, আকাশ থেকে উৎক্ষেপণের জন্য এটি শুধুমাত্র Sukhoi Su-30MKI যুদ্ধবিমানে ব্যবহার করা যায়। এর কারণ হলো, বর্তমান BrahMos ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল আকার এবং ওজন:

  • দৈর্ঘ্য: ৮.২ মিটার (স্থল ও নৌ সংস্করণ) এবং ৮.০ মিটার (আকাশ সংস্করণ)
  • ওজন: ৩,০০০ কেজি (স্থল ও নৌ সংস্করণ) এবং ২,২০০-২,৫০০ কেজি (আকাশ সংস্করণ)

এই বিশাল ওজনের কারণে একটি Sukhoi Su-30MKI বিমানে কেবল একটি BrahMos ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা সম্ভব হয়। এতে বিমানের জ্বালানি ক্ষমতা এবং দ্রুততার ওপর প্রভাব পড়ে। ফলে ভারতের বিমানবাহিনীর অন্য গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিমান যেমন HAL Tejas, MiG-29UPG এবং Mirage 2000-এ এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা যায় না।

BrahMos-NG-এর নতুনত্ব এবং সুবিধা:

BrahMos-NG এই সমস্ত সমস্যা সমাধানের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটিকে অনেক ছোট এবং হালকা করে ডিজাইন করা হয়েছে, কিন্তু এর মূল ক্ষমতা বা কার্যকারিতা একই রকম রাখা হয়েছে।

আকার ও ওজন:

  • ওজন: প্রায় ১.৩-১.৬ টন (বর্তমান সংস্করণের থেকে ৫০% হালকা)
  • দৈর্ঘ্য: ৫-৬ মিটার (আগের থেকে প্রায় ৩ মিটার ছোট)
  • ব্যাস: ৫০ সেমি (আগে ছিল ৬৭ সেমি)

কর্মক্ষমতা:

  • গতি: Mach 3.5 (আগের Mach 2.8-3.0 গতির থেকে আরও দ্রুত)
  • পাল্লা: ২৯০ কিমি (বর্তমান পাল্লা বজায় রাখা হয়েছে)
  • ওয়ারহেড: ২০০-৩০০ কেজি ওজনের প্রচলিত উচ্চ-বিস্ফোরক পেলোড

বিশেষ প্রযুক্তি:

  • স্টেলথ প্রযুক্তি: ছোট আকারের কারণে এটি শত্রুপক্ষের রাডারে সহজে ধরা পড়বে না।
  • AESA রাডার: এতে যান্ত্রিকভাবে স্ক্যান করা রাডারের পরিবর্তে আধুনিক Active Electronically Scanned Array রাডার ব্যবহার করা হয়েছে।
  • উন্নত নির্দেশিকা: ইলেকট্রনিক জ্যামিং-এর বিরুদ্ধে এটি আরও বেশি সুরক্ষিত।

বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারের সুবিধা:

BrahMos-NG-এর ছোট আকার এবং কম ওজনের কারণে এটিকে এখন অনেক ধরনের সামরিক প্ল্যাটফর্মে ব্যবহার করা যাবে, যা ভারতের আক্রমণ ক্ষমতাকে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেবে।

  • বিমান:
    • Sukhoi Su-30MKI এখন একটির পরিবর্তে তিনটি BrahMos-NG বহন করতে পারবে।
    • HAL TEJAS MK-1A দুটি BrahMos-NG বহন করতে সক্ষম হবে।
    • MiG-29UPG এবং Mirage-2000-এও এটি যুক্ত করার পরিকল্পনা চলছে।
    • ভবিষ্যতে Dassault Rafale এবং HAL TEJAS MK-2-এর জন্যও এটি উপযোগী হবে।
  • নৌবাহিনী:
    • এটি P75I শ্রেণীর সাবমেরিনের টর্পেডো টিউব এবং Vertical Launch System (VLS) থেকে উৎক্ষেপণ করা যাবে।
    • ছোট জাহাজ বা কর্ভেটেও এটি স্থাপন করা যাবে, যা আগে সম্ভব ছিল না।

২০২৬ সালে প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ:

DRDO সূত্র অনুযায়ী, BrahMos-NG-এর কাজ দ্রুত গতিতে চলছে।

  • প্রথম উৎক্ষেপণ: ২০২৬ সালে এর প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ হওয়ার কথা।
  • উৎপাদন: ২০২৭-২০২৮ সাল থেকে এর উৎপাদন শুরু হবে।
  • উৎপাদন কেন্দ্র: উত্তরপ্রদেশের BrahMos Aerospace কেন্দ্রে এটি তৈরি করা হবে।
  • উৎপাদন ক্ষমতা: প্রাথমিকভাবে বছরে ৮০-১০০টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হবে, যা পরে ১৫০টি পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।

ভারতীয় বিমানবাহিনী ইতিমধ্যেই পাঁচ বছরে প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪০০টি BrahMos-NG ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে।

‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সাফল্য এবং কৌশলগত গুরুত্ব:

BrahMos-NG-এর এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন ভারতের পুরনো BrahMos ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা সম্প্রতি অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় প্রমাণিত হয়েছে। DRDO চেয়ারম্যান ড. সমীর কামাত জানান, এই অপারেশনে সন্ত্রাসবাদী অবকাঠামো ধ্বংস করার জন্য Sukhoi MK-1 প্ল্যাটফর্ম থেকে উৎক্ষেপণ করা BrahMos ক্ষেপণাস্ত্রই ছিল প্রধান অস্ত্র। এই অপারেশনটি পাকিস্তান এবং পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিগুলোতে সুনির্দিষ্ট আঘাত হানতে সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইলের কৌশলগত গুরুত্ব প্রমাণ করেছে।

আকাশতীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা:

BrahMos-এর আক্রমণাত্মক ক্ষমতার পাশাপাশি ভারতের নিজস্ব তৈরি আকাশতীর এয়ার ডিফেন্স কন্ট্রোল অ্যান্ড রিপোর্টিং সিস্টেম অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করে। এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা পাকিস্তানের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সফলভাবে প্রতিহত করে। এটি প্রমাণ করে যে ভারতের দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এখন কতটা সমন্বিত এবং উন্নত।

আত্মনির্ভর ভারতের সাফল্য:

BrahMos-NG-এর এই উন্নয়ন ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদনে রেকর্ড সাফল্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত অর্থবর্ষ ২০২৪-২৫-এ ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ১,৫০,৫৯০ কোটি, যা আগের বছরের চেয়ে ১৮% বেশি। এই সাফল্য আত্মনির্ভর ভারত উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উদ্যোগের ফলে ভারত এখন শুধু দেশীয় চাহিদা মেটাচ্ছে না, বরং বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।

DRDO চেয়ারম্যান কামত আশা প্রকাশ করেছেন যে ২০২৮-২৯ সালের মধ্যে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি ৫০,০০০ কোটি-তে পৌঁছাবে। অপারেশন সিঁদুর’-এর সাফল্যের পর BrahMos, Pinaka, ATAGS এবং Akash-এর মতো ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহও অনেক বেড়েছে।

এই মুহূর্তে

ইয়ান লেকান অ্যানথ্রোপিকের ৫০% চাকরি হারানোর পূর্বাভাস খারিজ করলেন মেটার প্রধান এআই বিজ্ঞানী

AI Chatbot আত্মহত্যা: চ্যাটবটের পরামর্শে ব্যক্তির মৃত্যু, উঠছে গুরুতর প্রশ্ন

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন ২০২৬: বাঁশের বেড়া থেকে এআই প্রযুক্তি, অভূতপূর্ব সুরক্ষা

Project বিষ্ণুর ET-LDHCM হাইপারসনিক মিসাইল: ভারত Mach 8 গতির পথে