জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁও-এ গত ২২ এপ্রিল এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে। ভারত এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছে, যদিও পাকিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার না করলেও নিজেদের পিঠ বাঁচাতে নানা অজুহাত তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর শক্তি এবং প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। বিশেষ করে, ভারতীয় সেনার যুদ্ধযানগুলির ক্ষমতা এখন সবার নজরে। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে এই যানগুলি শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। আসুন জেনে নিই এই শক্তিশালী যুদ্ধ যানগুলির সম্পর্কে।
Mahindra Armado ALSV:
Mahindra Armado লাইট স্পেশালিস্ট ভেহিকেল (ALSV) একটি হালকা ওজনের যুদ্ধযান, যা বিশেষভাবে সেনাবাহিনীর ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর বিশেষত্ব হল এর মডুলার ডিজাইন, যা এটিকে সব ধরণের রাস্তায় দ্রুত চলতে সাহায্য করে। এছাড়াও, এটিকে বিভিন্ন কাজের জন্য তৈরি করা যায়। এটি শুধুমাত্র ব্যালিস্টিক সুরক্ষা দেয় না, সেইসাথে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য বিশেষ সুবিধা সম্পন্ন।
এতে একটি গান হ্যাচ, রান-ফ্ল্যাট সিস্টেম, টায়ার ইনফ্লেশন সিস্টেম, এয়ার ফিল্টারেশন এবং স্ক্যাভেঞ্জিং সিস্টেমের মতো সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এই গাড়িতে ৩.২ লিটারের ৬-সিলিন্ডারের টার্বো ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে, যা ২১৫ bhp-এর সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং ৫০০ Nm টর্ক তৈরি করে। এতে ৬-৮ জন লোকের বসার ক্ষমতা আছে।
এর পে-লোড ক্ষমতা ১০০০ কেজি এবং এর মোট ওজন ২৫০০ কেজি। আরমাডোকে যা সবচেয়ে আলাদা করে তোলে, তা হল এর অসাধারণ সুরক্ষা বৈশিষ্ট্য। STANAG লেভেল 1 ব্যালিস্টিক সুরক্ষা যুক্ত এই গাড়িটিকে STANAG লেভেল 2 পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যায়। গাড়ির বডি এতটাই মজবুত যে এটি যেকোনো ধরণের আক্রমণ সহজেই সহ্য করতে পারে। মাল্টি-লেয়ার্ড বুলেট প্রুফ গ্লাস, এয়ার ফিল্টারেশন সিস্টেম এবং ব্লাস্ট মিটিগেশন ফ্লোর ম্যাট এটিকে অনেক উন্নত করে তোলে।
Kalyani M4:
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে সম্প্রতি Kalyani M4 যুক্ত হয়েছে। লাদাখ সীমান্তে ভারত ও চীনের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার সময় সেনাবাহিনী এই গাড়ির জন্য বরাত দিয়েছিল। Kalyani M4 ভারতে তৈরি একটি বর্মযুক্ত যুদ্ধযান, যা কল্যাণী গ্রুপের পুনের প্রতিরক্ষা সংস্থা ভারত ফোর্জ বানিয়েছে।
Kalyani M4 কে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিশেষ চাহিদার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই গাড়ি খারাপ রাস্তায় খুব দ্রুত চলতে পারে এবং ল্যান্ড মাইন, ৫০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত টিএনটি বা আইইডি বিস্ফোরণ সহ্য করতে পারে। এর সর্বোচ্চ গতি প্রায় ১৪০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা এবং এটি ২.৩ টন পর্যন্ত ওজন তুলতে সক্ষম।
Kalyani M4 কে মূলত উদ্ধারকার্য এবং সেনাদের আরও ভালো সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এতে ৮ জন লোকের বসার ব্যবস্থা আছে এবং সমস্ত বর্মের সাথে M4-এর ওজন প্রায় ১৬,০০০ কেজি। এর ৪৩-ডিগ্রি অ্যাপ্রোচ এবং ৪৪-ডিগ্রি ডিপারচার অ্যাঙ্গেল রয়েছে এবং এটি ৯০০ মিলিমিটার পর্যন্ত জলের গভীরতায়ও নামতে পারে, যা এটিকে কঠিন এলাকা বা নদী পার করতে সাহায্য করে।
Mahindra MPV-I:
মাহিন্দ্রার তৈরি একটি মাইন প্রোটেক্টেড ভেহিকেল, এটি বিশেষ ধরনের অফ-রোড গাড়ি, যা মাইন রেসিস্ট্যান্ট অ্যামবুশ প্রোটেক্টেড। সশস্ত্র সেনা পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হয়। ছয় চাকার এই গাড়িটিতে ২৩০ হর্সপাওয়ারের একটি ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ ব্যাপার হল, এটি অল হুইল ড্রাইভ সিস্টেমে সজ্জিত, অর্থাৎ এর সব চাকায় ইঞ্জিন শক্তি যোগায়, যা খারাপ রাস্তাতেও এটিকে চলতে সাহায্য করে।
এই গাড়িটি ব্যালিস্টিক এবং মাইন সুরক্ষা প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি। এটি CEN লেভেল B6 এর পাশের সুরক্ষা দেয় এবং স্ট্যাং লেভেল 4A পর্যন্ত ব্লাস্টিক সুরক্ষাও দেয়। এর মানে হল, এই গাড়িটি ৯০ ডিগ্রি কোণে ১০ মিটার দূরত্ব থেকে গুলির সরাসরি আঘাত সহ্য করতে পারে। ভারী গোলাগুলি, বোমা বিস্ফোরণ বা মাইন বিস্ফোরণ – সব ধরনের আক্রমণই এই গাড়ি সহজে মোকাবিলা করতে পারে।
Aditya:
Aditya মাইন প্রোটেক্টেড ভেহিকেল (OFB) হল এক ধরনের মাইন প্রতিরোধী অ্যামবুশ প্রোটেক্টেড যুদ্ধ যান। এটি ভারতীয় সেনা এবং কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী ব্যাবহার করে। বিস্ফোরক এবং ছোট অস্ত্রের আক্রমণ থেকে সৈন্যদের রক্ষা করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি একটি বর্মযুক্ত যুদ্ধযান যা তার শক্তিশালী কাঠামোর ওপর যেকোনো ধরনের হামলা সহ্য করতে পারে। এর নির্মাণ ক্যাস্পির এমকে II-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা ভারত ১৯৯০-এর দশকে ব্যবহার করেছিল।
DRDO দ্বারা তৈরি ‘Aditya’ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে থাকা সৈন্যদের সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর শক্ত বডি ১০ মিটার দূরত্ব থেকে ওপরের দিকে ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত এবং পাশ থেকে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত গুলির আঘাত সহ্য করতে পারে। শুধু তাই নয়, এটি IED এবং TNT বিস্ফোরণও সহজে সহ্য করতে সক্ষম। এর V-আকৃতির, স্টিলের তৈরি কাঠামো বিস্ফোরণের ধাক্কা থেকে গাড়িতে থাকা সৈন্যদের রক্ষা করতে সাহায্য করে।
ভারতীয় সেনা শুধুমাত্র এই যুদ্ধ যানগুলির উপর নির্ভর করে না, বরং আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের আরও শক্তিশালী করেছে। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার র্যাঙ্কিংয়ে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী বিশ্বে চতুর্থ স্থানে রয়েছে, যেখানে পাকিস্তান ১২তম। ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট ২০২৫ সালে ৮১ বিলিয়ন ডলার, যা পাকিস্তানের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া, ভারতের কাছে ৭,০৭৪টি যুদ্ধ যান এবং ১১,২২৫টি আর্টিলারি রয়েছে।
জম্মু-কাশ্মীরে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় সেনার যুদ্ধ যানগুলি দেশের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত। বজ্রের মতো শক্তিশালী যানগুলি শত্রুদের বিরুদ্ধে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে সক্ষম। ভারতীয় সেনার এই প্রস্তুতি এবং প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দেশের নিরাপত্তার প্রতি তাদের অঙ্গীকারের প্রমাণ।
*এই তথ্যগুলি বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত খবর এবং ভারতীয় সেনার সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে সংগৃহীত।