জম্মু ও কাশ্মীরের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখন চলছে প্রকৃতির এক কঠিন পরীক্ষা। ক্যালেন্ডারে এখন ‘চিলা-ই-কালান’-এর সময়। অর্থাৎ, ২১ ডিসেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত যে ৪০ দিন তীব্রতম শীতে সবকিছু জমে বরফ হয়ে যায়, সেই সময়টা। সাধারণত, এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় উপত্যকায় সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ প্রায় তলানিতে এসে ঠেকে। কিন্তু এবার সেই চেনা ছবিটা বদলে গেছে, যা নতুন করে কপালে ভাঁজ ফেলেছে ভারতীয় সুরক্ষা এজেন্সিগুলোর।
প্রকৃতির এই প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করেই ভারতীয় সেনাবাহিনী গত এক সপ্তাহ ধরে এক বিশাল এবং তীব্র অভিযান চালাচ্ছে। লক্ষ্য—পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে থাকা ৩০ থেকে ৩৫ জন দুর্ধর্ষ জৈশ-ই-মহম্মদ (JeM) জঙ্গিকে খুঁজে বের করা।
কেন এবারের শীত অন্যরকম?
সুরক্ষা এজেন্সিগুলোর মতে, এবারের শীতে সন্ত্রাসীদের গতিবিধি একেবারেই অস্বাভাবিক। অন্যান্য বছর এই সময়ে তারা নিজেদের ডেরায় লুকিয়ে থাকত বা শীত কমার অপেক্ষা করত। কিন্তু এবার তারা সেই নিয়ম ভেঙে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ডোডা এবং কিশ্তওয়ার জেলার উঁচু পাহাড়ি এলাকাগুলোতে তারা ছড়িয়ে পড়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, এই মুহূর্তে সন্ত্রাসীরা বেশ কোণঠাসা। পাহালগামে সাম্প্রতিক হামলার পর স্থানীয় কাশ্মীরি বাসিন্দারা সন্ত্রাসীদের ওপর ক্ষুব্ধ। ফলে, আগে যেভাবে তারা স্থানীয়দের বাড়িতে আশ্রয় বা সাহায্য পেত, এখন আর তা পাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তারা লোকালয় ছেড়ে অনেক উঁচুতে, নির্জন পাহাড়ি এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে আশ্রয় নিচ্ছে।
একজন বরিষ্ঠ গোয়েন্দা অফিসারের কথায়, “এই তীব্র শীতে এত উচ্চতায় আশ্রয় নেওয়া লজিস্টিকস এবং স্বাস্থ্যের দিক থেকে ওদের জন্য বিশাল ঝুঁকির। এই আবহাওয়ায় বেশিক্ষণ টিকে থাকা কঠিন এবং সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার সম্ভাবনাও বেশি। কিন্তু তবুও তারা এই ঝুঁকি নিচ্ছে, যা প্রমাণ করে তারা কতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে। হয়তো ছোটখাটো কোনো হামলা চালিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চাইছে তারা।”
সেনাবাহিনীর পাল্টা কৌশল: ‘অপারেশন সিন্দুর’ এবং উইন্টার ওয়ারফেয়ার
পাহালগাম হামলার প্রতিশোধ নিতে এবং সন্ত্রাসীদের কোমর ভেঙে দিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী আগেই ‘অপারেশন সিন্দুর’ শুরু করেছিল। এই অপারেশনের ফলে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক এবং অবকাঠামো অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। সীমান্তে কড়া পাহারার কারণে পাকিস্তান থেকে নতুন করে অনুপ্রবেশ প্রায় শূন্যের কোঠায়।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান এখন কাশ্মীরের ভেতরে আগে থেকেই লুকিয়ে থাকা স্লিপার সেল বা পুরনো জঙ্গিদের সক্রিয় করার চেষ্টা করছে। অফিসাররা বলছেন, এখন ছোট কোনো হামলা করতে পারলেও সেটা তাদের মনোবল বাড়াবে এবং নতুন রিক্রুটমেন্টে সাহায্য করবে। তাই জঙ্গিরা এখন ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কাজ করছে এবং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছে যাতে ধরা না পড়ে।
এই নতুন প্যাটার্ন সুরক্ষা বাহিনীর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। আগে শীতকালে অভিযানের তীব্রতা কিছুটা কম থাকত। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সেনাবাহিনীও তাদের কৌশল বদলেছে। পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় ‘স্নোবাউন্ড বেস’ বা বরফে ঢাকা অস্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করে কঠিন জমিতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে জওয়ানরা।
সতর্ক বার্তা
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, তুষারপাতের সুযোগ নিয়ে যাতে কোনো অঘটন না ঘটে, তার জন্য সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে হবে। পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে লঞ্চপ্যাডগুলোতে জঙ্গিরা তৈরি থাকলেও, ভারতের মজবুত সুরক্ষা ব্যবস্থার কারণে তারা সুবিধা করতে পারছে না।
সার্বিক পরিস্থিতি এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কাশ্মীরে এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ‘ফাইটিং সিজন’ নেই। সন্ত্রাসীরা যখন আবহাওয়া দেখে থামছে না, তখন ভারতীয় বাহিনীও সারা বছর, ২৪ ঘণ্টাই সতর্ক থাকতে প্রস্তুত। শীতের এই নতুন লড়াইয়েও শেষ পর্যন্ত জয় ভারতেরই হবে, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন নিরন্তর সতর্কতা।