নতুন বছর বরণের আনন্দে কি এবার বড়সড় ভাঁটা পড়তে চলেছে? বর্ষবরণের রাতে জমিয়ে পার্টির প্ল্যান করছেন, ভাবছেন অনলাইনে গরম গরম খাবার বা জরুরি জিনিস অর্ডার করবেন—কিন্তু সাবধান! আপনার অর্ডার হয়তো সময়মতো পৌঁছাবে না, বা আদৌ পৌঁছাবে কিনা সন্দেহ। কারণ, বছরের শেষ দিন, অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর, সারা ভারত জুড়ে এক বিশাল ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন গিগ ওয়ার্কার বা অ্যাপ-নির্ভর ডেলিভারি কর্মীরা।
কারা ডাকলেন এই ধর্মঘট এবং কেন?
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা ডেলিভারি পার্টনাররা—যারা রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে Zomato, Swiggy, Blinkit, Amazon, Zepto, Urban Company এবং Flipkart-এর মতো বড় বড় কোম্পানির হয়ে পরিষেবা দেন, তারা এবার নিজেদের অধিকারের দাবিতে লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছেন।
তাদের অভিযোগ গুরুতর। দিন দিন তাদের আয় কমছে, অথচ কাজের চাপ বাড়ছে পাহাড়সম। তার ওপর নেই কোনো জীবনের নিরাপত্তা। এই শোষণের বিরুদ্ধেই তারা একত্রিত হয়েছেন। এই বিশাল আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছে ‘ইন্ডিয়ান ফেডারেশন অফ অ্যাপ-বেসড ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স’ (IFAT) এবং বেশ কয়েকটি রাজ্যের শক্তিশালী ইউনিয়ন, যেমন—‘কর্নাটক অ্যাপ-বেসড ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’ এবং ‘তেলেঙ্গানা গিগ অ্যান্ড প্ল্যাটফর্ম ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’।
নেতৃত্ব কী বলছেন?
তেলেঙ্গানা ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা এবং IFAT-এর জাতীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ সালাউদ্দিন এই আন্দোলন নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এটা শুধু একটা প্রতিবাদ নয়, এটা আমাদের ন্যায়, সম্মান আর দায়িত্বের লড়াই। সরকার আর কতদিন চুপ করে তামাশা দেখবে? কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা লাভ করছে, কিন্তু আমাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে!”
কর্নাটক ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, এই ধর্মঘট গিগ ইকোনমির বর্তমান করুণ অবস্থার বিরুদ্ধে। যেখানে কর্মীদের জন্য নেই ন্যায্য মজুরি, নেই নিরাপত্তা, নেই সম্মান এবং সামাজিক সুরক্ষা।
কী কী দাবি নিয়ে পথে নামছেন কর্মীরা?
ডেলিভারি কর্মীদের দাবিগুলো খুবই স্পষ্ট এবং তাদের জীবন-জীবিকার সাথে সরাসরি যুক্ত। চলুন এক নজরে দেখে নিই তাদের প্রধান দাবিগুলো:
১. বিপজ্জনক ‘১০ মিনিটের ডেলিভারি‘ বন্ধ: কোম্পানিগুলোর চালু করা ১০ মিনিটে গ্রোসারি বা খাবার পৌঁছে দেওয়ার সিস্টেম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। কর্মীরা বলছেন, এই অসম্ভব টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে তাদের জীবন এবং পথচারীদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
২. ন্যায্য ও স্বচ্ছ মজুরি: কাজের বিনিময়ে ন্যায্য পারিশ্রমিক দিতে হবে এবং মজুরি কাঠামো স্বচ্ছ হতে হবে। পাশাপাশি ভালো ইনসেনটিভের ব্যবস্থাও করতে হবে।
৩. কাজের নির্দিষ্ট সময় ও বিশ্রাম: কাজের সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে এবং ডিউটির মাঝে বাধ্যতামূলক বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৪. অ্যাকাউন্ট ব্লকিংয়ে স্বচ্ছতা: কোনো কারণ দর্শানো ছাড়া হুটহাট কর্মীদের আইডি বা অ্যাকাউন্ট ব্লক করা চলবে না। ব্লক করার আগে সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
৫. নিরাপত্তা ও বিমা: কাজের সময় নিরাপত্তার জন্য উন্নত মানের যন্ত্রপাতি এবং দুর্ঘটনার জন্য পর্যাপ্ত ইনস্যুরেন্স কভারেজ দিতে হবে।
৬. অ্যালগরিদমের পক্ষপাতিত্ব দূরীকরণ: কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে অ্যাপের অ্যালগরিদম যেন কোনো পক্ষপাতিত্ব না করে, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
৭. অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা: অ্যাপের মধ্যেই কর্মীদের অভিযোগ জানানোর সিস্টেম আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে।
৮. সামাজিক সুরক্ষা: চাকরির নিরাপত্তা এবং পেনশন, স্বাস্থ্য বিমা ও দুর্ঘটনার কভারের মতো সামাজিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে হবে।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
৩১ ডিসেম্বর নতুন বছরের আগের সন্ধ্যাটি অনলাইন ডেলিভারি কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যবসার ‘পিক টাইম’। এই সময়ে সারা দেশে ধর্মঘট হলে খাবার, গ্রোসারি বা অনলাইন শপিংয়ের ডেলিভারিতে বড় ধরনের বিভ্রাট ঘটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। কোম্পানিগুলো বড় চাপের মুখে পড়তে পারে। কিন্তু দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া কর্মীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আর সহ্য করা সম্ভব নয়—এবার তারা তাদের অধিকার আদায় করেই ছাড়বেন।