ভারতের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের জন্য ভারত সরকার একটি যুগান্তকারী ঘোষণা করেছে। দীর্ঘদিনের পুরনো এবং জটিল শ্রম আইনগুলিকে বিদায় জানিয়ে, সরকার নতুন ৪টি শ্রমবিধি বা লেবার কোড (Labour Codes) চালু করার কথা ঘোষণা করেছে। এই নতুন নিয়মগুলি কার্যকর হয়েছে ২০২৫-এর ২১ নভেম্বর থেকেই।
সহজ কথায় বলতে গেলে, এতদিন ধরে ভারতে মোট ২৯টি আলাদা আলাদা কেন্দ্রীয় শ্রম আইন চালু ছিল, যার বেশিরভাগই তৈরি হয়েছিল সেই ব্রিটিশ আমলে বা স্বাধীনতার ঠিক পরে (১৯৩০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে)। আজকের আধুনিক যুগে সেই নিয়মগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অচল হয়ে পড়েছিল। তাই সরকার সেই ২৯টি আইনকে এক জায়গায় করে, আরও সহজ এবং আধুনিক ৪টি নতুন বিধিতে রূপান্তরিত করেছে।
কী এই ৪টি নতুন শ্রমবিধি?
সরকার যে চারটি নতুন বিধি এনেছে সেগুলি হলো:
১. Code on Wages 2019 (মজুরি বিধি
২. Industrial Relations Code 2020 (শিল্প সম্পর্ক বিধি)
৩. Code on Social Security 2020 (সামাজিক নিরাপত্তা বিধি)
৪. Occupational Safety, Health and Working Conditions Code 2020 (পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও কাজের শর্ত বিধি)
এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো—শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, তাদের হকের পাওনা সময়মতো মেটানো এবং ভারতের শিল্প ব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করে তোলা। এটি ‘আত্মনির্ভর ভারত’ গড়ার পথে একটি বড় পদক্ষেপ।
সাধারণ কর্মীর জীবনে কী কী পরিবর্তন আসছে?
এই নতুন নিয়মে একজন সাধারণ চাকুরিজীবী বা শ্রমিকের জীবনে কী সুবিধা হবে, চলুন তা দেখে নেওয়া যাক:
১. নিয়োগপত্র বা Appointment Letter বাধ্যতামূলক: আগে অনেক কোম্পানিতেই কর্মীদের কোনো লিখিত নিয়োগপত্র দেওয়া হতো না, ফলে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকতো। নতুন নিয়মে, সমস্ত শ্রেণির কর্মীর জন্য Appointment Letter দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে চাকরির স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বাড়বে।
২. সবার জন্য ন্যূনতম মজুরি (Minimum Wage): আগে শুধুমাত্র কিছু নির্দিষ্ট বা ‘তপশিলি ভুক্ত’ শিল্পের কর্মীরাই ন্যূনতম মজুরির অধিকার পেতেন। এখন Code on Wages 2019-এর আওতায় দেশের সমস্ত কর্মী সঠিক ন্যূনতম মজুরি পাবেন।
৩. সময়মতো বেতন: আগে মালিকপক্ষ ইচ্ছেমতো দেরি করে বেতন দিত। এখন আইনে বলা হয়েছে, কর্মচারীদের বেতন সময়মতো দিতে হবে। এর ফলে কর্মীদের আর্থিক দুশ্চিন্তা কমবে।
৪. গিগ (Gig) ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের সুরক্ষা: বর্তমান যুগে যারা বিভিন্ন অ্যাপ-নির্ভর কাজ করেন (যেমন ডেলিভারি পার্টনার বা ফ্রিল্যান্সার), তাদের জন্য আগে কোনো সামাজিক সুরক্ষা ছিল না। এবার সামাজিক সুরক্ষা বিধি ২০২০-র আওতায় গিগ এবং প্ল্যাটফর্ম কর্মীরাও PF, ESIC, এবং বিমার সুবিধা পাবেন।
৫. বিনামূল্যে বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা: মালিকপক্ষকে এখন থেকে ৪০ বছরের বেশি বয়সী সমস্ত কর্মীর জন্য বছরে একবার বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা (Free Annual Health Check-up) করাতে হবে। এটি কর্মীদের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়ার জন্য একটি বড় পদক্ষেপ।
৬. মহিলাদের কাজের সুযোগ ও নিরাপত্তা: আগে রাতের শিফ্টে মহিলাদের কাজ করার ওপর অনেক বিধিনিষেধ ছিল। নতুন নিয়মে মহিলারা সব ধরনের কাজে এবং রাতের শিফ্টেও কাজ করতে পারবেন। তবে, মালিককে অবশ্যই তাদের সম্মতি নিতে হবে এবং নিরাপত্তার (Security) সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করতে হবে। এতে মহিলাদের রোজগার এবং ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ বাড়বে।
৭. দেশজুড়ে একই ESIC সুবিধা: আগে ১০ জনের কম কর্মী থাকলে ESIC-এর সুবিধা পাওয়া যেত না। এখন থেকে বিপজ্জনক কাজের ক্ষেত্রে একজন কর্মী থাকলেও ESIC বাধ্যতামূলক। এছাড়া সারা ভারত জুড়ে এই সুবিধা পাওয়া যাবে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রের কর্মীদের জন্য বিশেষ সুখবর
তথ্য প্রযুক্তি (IT) কর্মীদের জন্য: আইটি সেক্টরে কাজের চাপ নিয়ে অনেক অভিযোগ থাকে। নতুন নিয়মে প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে বেতন দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া মহিলাদের রাতের শিফ্টে কাজের সুযোগ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য কড়া ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মিডিয়া ও বিনোদন জগত: যারা ডিজিটাল মিডিয়া, অডিও-ভিজ্যুয়াল বা সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত, এমনকি ডাবিং আর্টিস্ট ও স্টান্টম্যানরাও এবার পূর্ণ আইনি সুবিধা পাবেন। তাদের নিয়োগপত্র দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে কাজ করালে ডবল (Double) মজুরি দেওয়ার নিয়ম করা হয়েছে।
নির্দিষ্ট মেয়াদী বা চুক্তিভিত্তিক কর্মী (Contractual Workers): যারা কনট্রাক্টে কাজ করেন, তারা এখন থেকে স্থায়ী কর্মীদের মতোই ছুটি, চিকিৎসা এবং সামাজিক সুরক্ষা পাবেন। আগে ৫ বছর কাজ না করলে গ্র্যাচুইটি মিলত না, এখন চুক্তির মেয়াদ ১ বছর পূর্ণ হলেই তারা গ্র্যাচুইটি পাবেন।
MSME ও ক্ষুদ্র শিল্প: ছোট শিল্পের কর্মীদের জন্যও ন্যূনতম বেতন এবং ওভারটাইমের টাকা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
খনি ও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প: খনিতে কাজ করা কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সপ্তাহে ৫৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না।
রপ্তানি (Export) ও টেক্সটাইল সেক্টর: এই ক্ষেত্রের কর্মীরা বছরে ১৮০ দিন কাজ করলেই বার্ষিক ছুটির সুবিধা পাবেন। এছাড়া ওভারটাইমের জন্য দ্বিগুণ বেতনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ভারতের শ্রমখাতে এক নতুন ভোরের সূচনা। একদিকে যেমন কর্মীদের শোষণ বন্ধ হবে এবং তারা PF, Gratuity, এবং স্বাস্থ্য বীমার মতো সুবিধা পাবেন, অন্যদিকে মালিকদের জন্যও ব্যবসার নিয়ম সহজ করা হয়েছে (যেমন—সারা দেশে একটি মাত্র লাইসেন্স ও রিটার্ন)।
২০২৫-এর ২১ নভেম্বর থেকে চালু হওয়া এই নিয়মগুলি ঠিকঠাক পালিত হলে, ভারতের কর্মক্ষেত্র আরও সুরক্ষিত এবং শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।