আজকের ডিজিটাল যুগে আমাদের জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। Facebook, Instagram বা WhatsApp-এ জমা থাকে আমাদের কত শত স্মৃতি, ছবি, আর ব্যক্তিগত কথাবার্তা। কিন্তু জীবনে তো কোনো নিশ্চয়তা নেই! হঠাৎ করে যদি কোনো অঘটন ঘটে যায়, তাহলে আপনার এই ‘ডিজিটাল সম্পত্তি’-র কী হবে? প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা আইনের গেরোয় পড়ে অনেক সময়ই মৃত ব্যক্তির পরিবার এই অ্যাকাউন্টগুলোর নাগাল পান না, দিনের পর দিন আদালতে চক্কর কাটতে হয়। তবে এবার সাধারণ মানুষের এই হয়রানি দূর করতে আসরে নামছে কেন্দ্র।
কেন্দ্রীয় সরকারের ইলেকট্রনিক্স ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রক বা MeitY একটি বিশেষ ‘ডিজিটাল উইল’ (Digital Will) বা ‘ডিজিটাল ভসিয়ত’-এর গাইডলাইন তৈরি করার কাজ শুরু করেছে। এই নিয়ম একবার আইনি রূপ পেলে, মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ক্লাউড স্টোরেজের মতো ডিজিটাল সম্পদ খুব সহজেই তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া যাবে। এর জন্য আর আগের মতো কোর্ট-কাছারিতে দৌড়াতে হবে না।
কেন এই নতুন নিয়ম এত জরুরি?
বর্তমানে আমাদের অনেকের কাছেই ভৌত সম্পত্তির পাশাপাশি ডিজিটাল সম্পদও অত্যন্ত মূল্যবান। Facebook-এর পুরোনো মেমরি, Instagram-এর রিলস, ক্রিপ্টোতে করা বড় অঙ্কের বিনিয়োগ বা Google Photos-এ সযত্নে রাখা অ্যালবামের শুধু যে আবেগগত দিক রয়েছে তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর বিশাল আর্থিক মূল্যও থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, মৃত ব্যক্তির পরিবার যখন এই সম্পদগুলোতে অ্যাক্সেস করতে চায়, তখন বাধা হয়ে দাঁড়ায় কড়া প্রাইভেসি আইন। ফলে আদালতের স্পেশাল অর্ডার ছাড়া এগুলো উদ্ধার করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে ওঠে।
নতুন এই ‘ডিজিটাল ভসিয়ত’ নিয়মে পুরো প্রক্রিয়াটি একদম জলবৎ তরলং হয়ে যাবে। ঠিক যেভাবে আপনি আপনার বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি বা ব্যাঙ্কের টাকা পরিবারের কোনো নির্দিষ্ট সদস্যের নামে উইলে লিখে দিয়ে যান, ঠিক একই পদ্ধতিতে এবার থেকে আপনার ডিজিটাল সম্পদও আইনিভাবে হস্তান্তর করা যাবে।
কী কী অন্তর্ভুক্ত থাকবে এই ডিজিটাল সম্পদে?
- Facebook, Instagram বা এক্স-এর মতো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট।
- ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট বা ডিজিটাল কারেন্সি।
- ক্লাউড স্টোরেজে সেভ করে রাখা ব্যক্তিগত ছবি, গুরুত্বপূর্ণ ভিডিয়ো এবং ফাইল।
- অনলাইন শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ বা NFT-এর মতো আধুনিক ডিজিটাল সম্পদ।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, Google, Facebook বা Apple-এর মতো বিশ্বের প্রথম সারির টেক জায়ান্টগুলো ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে কিছু নিজস্ব ফিচার চালু করে রেখেছে। যেমন, Google-এর রয়েছে Inactive Account Manager, Facebook-এ আছে Legacy Contact এবং Apple ব্যবহারকারীদের জন্য রয়েছে Digital Legacy অপশন। কিন্তু আমাদের দেশে এর কোনো নির্দিষ্ট আইনি স্বীকৃতি বা সুস্পষ্ট সরকারি গাইডলাইন না থাকায় এগুলো সব ক্ষেত্রে পুরোপুরি কাজে আসে না। সরকারের এই নতুন নিয়ম সেই আইনি ফাঁকটাই পূরণ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবার ও পরিজনদের জন্য এর সুবিধা কী?
- অকারণে আদালতে ছোটাছুটি করা এবং আইনি খরচ অনেকটাই কমবে।
- মৃত ব্যক্তির স্মৃতি এবং মূল্যবান ডিজিটাল সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে।
- পরিবারের অজান্তে থাকা অনেক অনলাইন বিনিয়োগ হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।
- পুরো হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি হবে অনেক বেশি স্বচ্ছ এবং দ্রুত।
বিশেষজ্ঞরা বরাবরই সতর্ক করে আসছেন, আজকের এই আধুনিক ডিজিটাল যুগে শুধু সোনা-দানা বা জমি-জমা নয়, আপনার অনলাইন অ্যাসেটও কিন্তু আপনার সম্পত্তির একটি বড় অংশ। তাই এখন থেকেই সবাইকে এই ‘ডিজিটাল উইল’ তৈরি করার বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত।
বলাই বাহুল্য, ভারত সরকারের এই সময়োপযোগী উদ্যোগ অগণিত শোকস্তব্ধ পরিবারের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর। এই বিষয়ে বিস্তারিত গাইডলাইন চূড়ান্ত হলেই তা খুব শীঘ্রই সাধারণ মানুষের জন্য প্রকাশ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।