গত ১০ নভেম্বরের সন্ধ্যাটা দিল্লির বুকে এক বিভীষিকা এঁকে দিল। লাল কেল্লার সামনে একটি হ্যুন্ডাই আই২০ গাড়িতে বিস্ফোরক ফেটে যায়, আর তার বলি হন ১২ জন নিরীহ মানুষ। এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে যে ব্যক্তিটির নাম উঠে এসেছে, তিনি হলেন ডাক্তার উমর নবী, যার আসল নাম উমর মোহাম্মদ। কিন্তু এই হৃদয়বিদারক ঘটনার চেয়েও বেশি চমকপ্রদ হলো তার যোগাযোগের পদ্ধতি—পরিচয় লুকিয়ে, বাতাসের মতো অদৃশ্য হয়ে!
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—এই শিক্ষিত সন্ত্রাসী তার বিদেশি ‘হ্যান্ডলার’-এর সঙ্গে কথা বলত একটি অতি-গোপন মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে। এটি এমন একটি অ্যাপ, যেখানে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য কোনো ফোন নম্বর লাগে না, কোনো ইমেল আইডি দিতে হয় না—অর্থাৎ, ব্যবহারকারী আক্ষরিক অর্থেই ‘অদৃশ্য’ থাকতে পারে।
যে অ্যাপটিকে সন্ত্রাসীরা তাদের যোগাযোগের ‘লাইফলাইন’ বানিয়েছিল, তার নাম হলো সেশন অ্যাপ (Session App)। গুগল প্লে স্টোরে এই অ্যাপটিকে ‘সেশান-প্রাইভেট মেসেঞ্জার’ (Session – Private Messenger) নামে পাওয়া যায়।
কেন এই অ্যাপ এত গোপনীয়?
- নম্বর বা ইমেল নেই: এখানে চ্যাট করতে কোনো ফোন নম্বর বা ইমেল আইডি-র প্রয়োজন নেই। এর বদলে ব্যবহারকারীকে একটি বিশেষ সেশন আইডি দেওয়া হয়, যা তাকে অনলাইনে একটি অনন্য (Unique) পরিচয় দেয়।
- কেন্দ্রীভূত সার্ভার নেই: WhatsApp বা Telegram-এর মতো এর কোনো কেন্দ্রীয় সার্ভার (Central Server) নেই। এটি একটি বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্কের (Decentralized Network) মাধ্যমে কাজ করে, যেখানে মেসেজ এনক্রিপ্ট করে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা হয় এবং ভিন্ন ভিন্ন সার্ভারের (Node) মাধ্যমে পাঠানো হয়।
- ডেটা লিক অসম্ভব: কোনো এক কোম্পানি বা কর্তৃপক্ষ ব্যবহারকারীর চ্যাটের ডেটা সংরক্ষণ করে না, তাই ডেটা বিক্রি বা লিক হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। সন্ত্রাসীদের জন্য এই ব্যবস্থা খুলে দেয় সম্পূর্ণ গোপনীয়তা!
তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, ডাক্তার উমর এই অ্যাপ ব্যবহার করে তুরস্কের অঙ্কারায় (Ankara) বসে থাকা তার হ্যান্ডলার, যার কোডনেম সম্ভবত ‘ইউকাসা‘ (Ukasa), তার সঙ্গে গোপন চ্যাট করত। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২২ সালের মার্চ মাস থেকেই এই গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে বিস্ফোরণের নীলনকশা তৈরি হচ্ছিল।
ডিএনএ–ই করল পরিচয় ফাঁস:
এত গোপন যোগাযোগের পরও সন্ত্রাসী উমর নবী ধরা পড়ল কীভাবে? বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে গাড়ির মধ্যে তার দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। প্রথমদিকে তার পরিচয় প্রায় অজানা ছিল।
কিন্তু তদন্তকারীরা হাল ছাড়েননি। গাড়ির ভেতর থেকে ছড়িয়ে পড়া শরীরের টুকরোগুলো সংগ্রহ করে তারা ডিএনএ (DNA) পরীক্ষা করেন। ফলস্বরূপ, উমর-এর ডিএনএ-এর সঙ্গে তার মায়ের ডিএনএ-এর শতভাগ (১০০ শতাংশ) মিল পাওয়া যায়। এই বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতেই সন্ত্রাসীর পরিচয় নিশ্চিত হয়।
প্রযুক্তির বিপদ: নতুন হোয়াইট কলার টেরর মডিউল
এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এক নতুন বিপদ: ‘হোয়াইট কলার টেরর মডিউল‘ (White Collar Terror Module)। অর্থাৎ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা উচ্চশিক্ষিত, সমাজে সম্মানিত লোকেরাই যে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে, এই ঘটনা তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। উমর মোহাম্মদ ছিলেন একজন ডাক্তার, যিনি পেশার আড়ালে এই দ্বৈত জীবন যাপন করতেন, যা সবাইকে হতবাক করেছে।
সেশন অ্যাপ-এর মতো প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের জন্য ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (Privacy) নিশ্চিত করে, কিন্তু যখন এই ক্ষমতা খারাপ হাতে পড়ে, তখন তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
দিল্লির এই বিস্ফোরণ শুধু একটা দুর্ঘটনা নয়—এটি পুরো দেশের জন্য এক সতর্কতার সংকেত। সরকারকে এখন এমন এনক্রিপ্টেড অ্যাপগুলোর ওপর কড়া নজর রাখতে হবে, যাতে প্রযুক্তির এই গোপনীয়তা ভবিষ্যতে কোনো কালো ছায়া নিয়ে ফিরে না আসে।
তদন্ত এখনও চলছে, এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন খুঁজছে সেই গোপন ষড়যন্ত্রের আরও সূত্র, যাতে এমন ‘অদৃশ্য’ সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করা যায়।