ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়া বরাবরই আলোচনার বিষয়। কখনো ভোটার তালিকা নিয়ে সমস্যা, কখনো ভোটকেন্দ্রে পৌঁছতে না পারার অভিযোগ। তবে এবার বিহার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়ে দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে মোবাইল ভিত্তিক ই-ভোটিং সিস্টেম চালু করতে চলেছে। আগামী ২৮ জুন ২০২৫ থেকে শহুরে স্থানীয় নির্বাচনে এই নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হবে। এই পদক্ষেপের ফলে লক্ষ লক্ষ ভোটার, বিশেষ করে যারা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন না, তারা সহজেই ভোট দিতে পারবেন। চলুন জেনে নিই এই ই-ভোটিং সিস্টেমের পুরো বিষয়টি।
ঘরে বসে ভোট দেওয়ার সুযোগ
বিহার রাজ্য নির্বাচন কমিশন এবং সি-ড্যাক (Centre for Development of Advanced Computing) মিলে এই ই-ভোটিং সিস্টেম তৈরি করেছে। এই সিস্টেমটি অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা ব্যবহার করতে পারবেন। আকাশবাণী নিউজ-এর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রাজ্য নির্বাচন কমিশনার দীপক প্রসাদ জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে প্রায় ১০,০০০ ভোটার এই সিস্টেমের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছেন। আশা করা হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে প্রায় ৫০,০০০ মানুষ মোবাইলের মাধ্যমে ভোট দেবেন।
এই সিস্টেমের মাধ্যমে ভোটাররা ঘরে বসেই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এটি বিশেষভাবে সেইসব মানুষের জন্য উপকারী, যারা দূরে থাকেন বা শারীরিক কারণে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন না।
দুটি অ্যাপের মাধ্যমে ভোটিং
ভোটিং প্রক্রিয়াকে নিরাপদ ও স্বচ্ছ করতে দুটি আলাদা মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে:
- e-Voting SECBHR: এটি সি-ড্যাক দ্বারা তৈরি।
- দ্বিতীয় অ্যাপটি বিহার রাজ্য নির্বাচন কমিশন তৈরি করেছে।
এই দুটি অ্যাপই গুগল প্লে স্টোর-এর মাধ্যমে ডাউনলোড করা যাবে। এই অ্যাপগুলোতে বেশ কিছু আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে:
- ব্লকচেইন ইন্টিগ্রেশন: এটি নিশ্চিত করবে যে ভোটের তথ্যের সঙ্গে কোনো কারচুপি করা যাবে না।
- লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন: ভোটারের মুখের লাইভ সনাক্তকরণ করা হবে।
- লাইভনেস ডিটেকশন: এটি নিশ্চিত com প্রতিটি ভোটারের জন্য নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য, বিহার রাজ্য নির্বাচন কমিশন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ই-ভোটিং সিস্টেম সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বচ্ছ। অডিট ট্রেইল এবং ডিজিটাল লকিং সিস্টেম ব্যবহার করা হবে, যাতে ভোটের তথ্য নিরাপদ থাকে এবং নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগে কেউ তাতে হাত দিতে না পারে। এটি ইভিএম-এর ভিভিপ্যাট সিস্টেমের মতোই কাজ করে, যেখানে ভোট দেওয়ার পর ভোটার দেখতে পারবেন তাদের ভোট কোন প্রার্থীর পক্ষে গেছে।
এই সুবিধা কাদের জন্য?
এই মোবাইল ভোটিং সিস্টেম বিশেষভাবে তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে যারা ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন না। এর মধ্যে রয়েছে:
- প্রবাসী শ্রমিক: যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করেন।
- দিব্যাঙ্গ নাগরিক: যাদের শারীরিক অক্ষমতার কারণে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া কঠিন।
- গর্ভবতী মহিলা: যারা শারীরিক অবস্থার কারণে যাতায়াত করতে পারেন না।
- বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক: যাদের বয়সের কারণে চলাফেরার সমস্যা হয়।
- গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তি: যারা হাসপাতালে বা বাড়িতে থাকেন।
এই সিস্টেমের লক্ষ্য হল প্রত্যেক ভোটারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, যাতে কেউ ভৌগোলিক বা শারীরিক কারণে ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত না হন।
প্রযুক্তিগত ভিত্তি কী?
এই ই-ভোটিং সিস্টেম নির্ভর করছে বেশ কিছু উন্নত প্রযুক্তির ওপর:
- অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন: ভোট গণনার কাজে ব্যবহৃত হবে।
- ফেস রিকগনিশন সিস্টেম: ভোটারের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করবে।
- সিকিউর ব্লকচেইন লেজার: প্রতিটি ভোটের তথ্য অপরিবর্তনীয়ভাবে সংরক্ষণ করবে।
এই প্রযুক্তিগুলো মিলে বিহারের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে শুধু ডিজিটালই নয়, ভবিষ্যৎমুখীও করে তুলছে।
নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা
মোবাইল ভোটিং নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল—এটা কি নিরাপদ? বিহার রাজ্য নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সব ধরনের নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে চলা হয়েছে। ব্লকচেইন টেকনোলজি এবং অডিট ট্রেইল ব্যবহার করে প্রতিটি ভোটের রেকর্ড নিরাপদ রাখা হবে। ভোট দেওয়ার পর ভোটাররা দেখতে পারবেন তাদের ভোট কোন প্রার্থীর পক্ষে গেছে। এছাড়া, ফলাফল ঘোষণার আগে তথ্য সুরক্ষিত রাখতে ডিজিটাল লকিং সিস্টেম ব্যবহার করা হবে।
এটা কি সারা ভারতে চালু হবে?
বিহার রাজ্য নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই সিস্টেম সফল হলে এটি অন্যান্য রাজ্যেও চালু করা যেতে পারে। ভারতে এখনো এমন কোনো ব্যবস্থা চালু হয়নি। বিশ্বে শুধুমাত্র ইস্টোনিয়া এই ধরনের মোবাইল ভোটিং ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু করেছে। বিহার এখন সেই তালিকায় নাম লেখাচ্ছে, যা গণতন্ত্রকে প্রযুক্তির সঙ্গে আরও শক্তিশালী করবে।