২২ গজের ‘জাম্বো’ এখন কর্পোরেট দুনিয়ার কিং! অনিল কুম্বলে কীভাবে তৈরি করলেন কোটি টাকার সাম্রাজ্য?

kumble

রিটায়ারমেন্টের পর বেশিরভাগ ক্রিকেটারকে দেখা যায় কমেন্ট্রি বক্সে অথবা গলফ কোর্সে। কেউ কেউ কভার ড্রাইভ মারতে ওস্তাদ হলেও, জীবনের ‘এক্সেল শিট’ মেলাতে গিয়ে হিমশিম খান। কিন্তু তিনি আলাদা। তিনি সেই বিরল প্রজাতির মানুষ যিনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সেমিস্টার পরীক্ষা দিয়ে 619 টেস্ট উইকেট নিয়েছেন, আর এখন ক্রিকেট ব্যাটের ভেতর কম্পিউটার ঢুকিয়ে ব্যবসার জগত কাঁপাচ্ছেন। তিনি আর কেউ নন, ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা ম্যাচ উইনার—অনিল কুম্বলে

বেঙ্গালুরুর বাসভানগুড়ির সেই লম্বা ছেলেটা থেকে আজকের সফল উদ্যোক্তা—এই গল্পটা শুধু উইকেট নেওয়ার নয়, এটি একটি নিখুঁত ‘প্ল্যানিং’-এর গল্প। আসুন দেখে নিই, কীভাবে একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে উঠলেন ক্রিকেটের ‘জাম্বো’ এবং সফল বিজনেসম্যান।

১. ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব থেকে লর্ডসের ময়দান

৮০-র দশকের দক্ষিণ বেঙ্গালুরু মানেই মধ্যবিত্ত পরিবার, আর স্বপ্ন বলতে BEML-এর চাকরি। কুম্বলের বাবা কৃষ্ণ স্বামী এবং মা সরোজা-র কাছেও মার্কশিট ছিল ম্যাচ ফিগারের চেয়ে বেশি দামী। ভাই দীনেশ-এর মতো অনিলও ভর্তি হলেন রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয় কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং-এ।

1989 সালে যখন তাঁর বন্ধুরা CET Rank নিয়ে চিন্তিত, তখন কুম্বলে কর্ণাটকের হয়ে ফার্স্ট-ক্লাস ডেবিউ করছেন। 1990-এর গ্রীষ্মে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যখন তিনি গ্রাহাম গুচ-কে বল করছিলেন, তখন তাঁর মাথায় ঘুরছিল সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার চিন্তা! তিনি ক্রিকেট এবং পরীক্ষা—দুটোতেই পাস করেন। কুম্বলের কাছে শিক্ষা ছিল একটা ‘সেফটি নেট’। তিনি জানতেন, ক্রিকেট না চললে ‘নাইন-টু-ফাইভ’ চাকরিতে ফেরার রাস্তা খোলা আছে।

২. স্পিনার নয়, তিনি ছিলেন ‘মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার’

শেষ ওয়ার্ন যদি হন শিল্পী, আর মুথাইয়া মুরলিধরন জাদুকর, তবে কুম্বলে ছিলেন একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি বল স্পিন করাতেন না, তিনি অঙ্ক কষতেন। অ্যাঙ্গেল, ট্রাজেক্টরি, ইম্প্যাক্ট পয়েন্ট—সব হিসেব করে বল করতেন।

সমালোচকরা বলতেন ‘আগলি বোলিং’, তিনি বলতেন ‘এফিশিয়েন্ট’। 1996-97 সালে অনেকে বলেছিলেন গুগলি ছাড়া বিদেশে সাফল্য আসবে না। তিনি চেন্নাই গিয়ে VV Kumar-এর কাছে অর্থোডক্স লেগ-স্পিন শিখলেন ঠিকই, কিন্তু ইরানি ট্রফি-তে পুরনো স্টাইলে ফিরে ৭ উইকেট নিয়ে বুঝিয়ে দিলেন—অন্যকে কপি করা মানে নিজেকে শেষ করা।

৩. টেনভিক (Tenvic): ১০ উইকেটের ব্র্যান্ডিং

2010 সালে কুম্বলে শুরু করেন তাঁর কোম্পানি Tenvic। নামটা এসেছে তাঁর সেই ঐতিহাসিক ‘Ten Wicket’ বা ‘Ten W’ থেকে। এর কাজ তিনটি: ১. স্কুল পর্যায়ে অ্যাথলিট তৈরি করা। ২. অবসরপ্রাপ্ত খেলোয়াড়দের কোচ বা ম্যানেজার হিসেবে চাকরি দেওয়া। ৩. বাচ্চাদের মোবাইল স্ক্রিন থেকে মাঠে নামানো।

2025 সালের মধ্যে প্রায় 80,000 বাচ্চার কাছে পৌঁছে গেছে Tenvic। এর অফিস বেঙ্গালুরুর বনশংকরী-তে, যা কুম্বলের নিজের এলাকা।

৪. স্পেকটাকম (Spektacom): ব্যাটের ভেতর টেকনোলজি

2017 সালে গৌরব মনচনদা-র সাথে মিলে তিনি তৈরি করেন Spektacom। এটি একটি টেক স্টার্টআপ। তারা তৈরি করেছে PowerBat স্টিকার।

  • কাজ: এটি ব্যাটের শোল্ডারে লাগানো থাকে। এটি রিয়েল-টাইমে ব্যাট স্পিড, পাওয়ার এবং টুইস্ট মাপে।
  • পার্টনার: Microsoft Azure ক্লাউড টেকনোলজি ব্যবহার করে এই ডেটা সোজা পৌঁছে যায় Star Sports-এর মতো ব্রডকাস্টারদের কাছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ওজন। ব্যাটসম্যানরা ব্যাটের ওজনে এক গ্রাম পরিবর্তনও মেনে নেন না। ইঞ্জিনিয়ার কুম্বলে এমন সেন্সর বানালেন যা অদৃশ্য এবং ওজনহীন! কোম্পানিটি ইতিমধ্যেই 1.5 Million Dollar ফান্ড রেইজ করেছে।

৫. দূরদর্শী বিনিয়োগকারী: ড্রোন থেকে প্ল্যান্ট-বেসড মিট

কুম্বলে শুধু নিজের কোম্পানি চালান না, তিনি একজন স্মার্ট ইনভেস্টরও। 2022 সালে তিনি তিনটি স্টার্টআপে টাকা লাগিয়েছেন:

  • Onsurety: গিগ ওয়ার্কারদের হেলথ ইনস্যুরেন্স দেয়।
  • Shaka Harry: প্ল্যান্ট-বেসড মিট বা মাংসের বিকল্প তৈরি করে।
  • Garuda Aerospace: ড্রোন কোম্পানি, যেখানে MS Dhoni-ও ইনভেস্টর।

কুম্বলে কেবল ফেমের জন্য চেক লেখেন না। তিনি লজিস্টিক্যাল সমস্যা সমাধান করতে পছন্দ করেন।

৬. অর্থের অঙ্ক এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা (AI)

বর্তমানে অনিল কুম্বলের নেট ওয়ার্থ প্রায় 11 Million Dollar (প্রায় 92 কোটি টাকা)। তাঁর আয়ের উৎস শুধু ক্রিকেট নয়—Spektacom, Tenvic, ইনস্যুরেন্স এবং সফটওয়্যার এন্ডোর্সমেন্ট।

ভবিষ্যতে তিনি ক্রিকেটে Artificial Intelligence (AI)-এর বিপ্লব আনতে চান। তিনি এমন অ্যালগরিদম বানাতে চান যা লাইভ ম্যাচে বলে দেবে—”ব্যাটসম্যান দুবার শাফল করলে কোন শট মারবে?” বা “তিনটে ইয়র্কারের পর বোলার কী করবে?” এটি কার্যত অঙ্কের জাদুতে ক্রিকেট খেলা।

৫৫ বছর বয়সে এসে অনিল কুম্বলে তাঁর জীবনের দ্বিতীয় ইনিংসেও অপরাজিত। তিনি নতুন প্রজন্মকে একটি সহজ শিক্ষা দিচ্ছেন—প্যাশন আর প্রফেশনের মধ্যে একটাকে বেছে নেওয়ার দরকার নেই। একটাকে ‘সেফটি নেট’ বানাও, তারপর এত পরিশ্রম করো যাতে সেই নেটটাই ‘ট্র্যাম্পোলিন’ হয়ে তোমাকে আরও উঁচুতে পৌঁছে দেয়। জাম্বো ঠিক সেটাই করেছেন—মাটি কামড়ে থেকে আজ আকাশ ছুঁয়েছেন।

এই মুহূর্তে

আগস্ট ২০২৬-এ আসছে Google Pixel 11, Vivo S2 সহ ৫টি সেরা smartphones launching in August 2026: সম্পূর্ণ তালিকা!

Hugging Face প্ল্যাটফর্মে ভয়ঙ্কর AI Deepfake-এর রমরমা: নারী ও শিশুদের টার্গেট করে তৈরি হচ্ছে অশালীন ছবি

ভারতীয় বিমান বাহিনী চালু করলো ‘সংকল্প-২০২৬’: রুশ যুদ্ধবিমানের দেশীয়করণে নতুন দিগন্ত

মহাকাশে আত্মনির্ভর ভারত: নভোচারী প্রযুক্তির দেশীয় উন্নয়নে জোরালো পদক্ষেপ