তামাকের বিকল্প হিসেবে বিক্রি হওয়া ভেষজ সিগারেট বা হার্বাল প্রোডাক্ট কি সত্যিই নিরাপদ? যদি আপনিও এমনটা ভেবে থাকেন, তাহলে আপনার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেশের জনপ্রিয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম যেমন Amazon, Flipkart এবং Blinkit-এ বিক্রি হচ্ছে এমন সব ভেষজ সিগারেট ও তামাকজাত দ্রব্য, যার কোনো স্বাস্থ্যবিধি বা সরকারি অনুমোদন নেই। এই গবেষণার নেপথ্যে রয়েছে ভারত সরকারের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সর্ববৃহৎ সংস্থা Indian Council of Medical Research (ICMR)-এর শাখা প্রতিষ্ঠান National Institute of Cancer Prevention and Research (NICPR)।
গবেষকদের মতে, “হার্বাল টোব্যাকো সিসেশন প্রোডাক্টস” বা HTCPs (ভেষজ তামাকজাত দ্রব্য) – যা মূলত ক্যাপসুল, লজেন্স, পাউডার এবং ভেষজ ধোঁয়ার আকারে পাওয়া যায় – এগুলিকে নিরাপদ এবং প্রাকৃতিক বিকল্প হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। ধূমপান ছাড়ার জন্য এগুলিকে ওষুধের বিকল্প হিসেবেও তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু ICMR-NICPR-এর বিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক ডঃ প্রশান্ত কুমার সিং জানিয়েছেন, “এইসব ভেষজ পণ্যগুলোর বেশিরভাগই ভারতীয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে অবাধে পাওয়া যায়। এদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোনো দাবি যাচাই করা হয় না এবং এর উপর ন্যূনতম কোনো নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাও নেই। এর ফলে একদিকে যেমন গ্রাহকদের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তেমনই তামাক নিয়ন্ত্রণেও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।”
টোব্যাকো কন্ট্রোল (Tobacco Control) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় Amazon, Flipkart, Blinkit, JioMart, এবং Meesho-এর মতো পাঁচটি প্রধান ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে মোট ৩১৬ টি ভিন্ন ভিন্ন ভেষজ তামাকজাত দ্রব্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ০.৫ শতাংশ প্রোডাক্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর নাম ব্যবহার করেছে, যা এক ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচার বলেই মনে করছেন গবেষকরা।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এইসব দ্রব্যের ৪৩.৭ % বিষমুক্ত বা ডিটক্সিফিকেশন এবং উদ্বেগ কমানোর মতো সুবিধার দাবি করেছে। অথচ এই দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। এমনকি মাত্র ১২ % পণ্যে বয়সের সীমাবদ্ধতা (age restrictions) উল্লেখ করা হয়েছে এবং কোনোটিতেই কার্যকরী বয়স যাচাই প্রক্রিয়া (age verification mechanisms) ছিল না। এর ফলে অল্পবয়সীরাও সহজেই এই ধরনের পণ্যের নাগাল পাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই ভেষজ পণ্যগুলি মূলত তিনটি ফর্মে বাজারে আসছে: দাহ্য পদার্থ (combustible products), যার পরিমাণ ৪২.৭ %; কাঁচা ভেষজ (raw herbal preparations), যা ৩৪.৫ %; এবং অন্যান্য ফর্ম্যাট যেমন গাম, ড্রপ, ক্যাপসুল ও প্যাচ, যা ২২.৮ %। মজার ব্যাপার হলো, এই পণ্যগুলি বিভিন্ন স্বাদে পাওয়া যাচ্ছে, যেমন: আপেল, পান, গুলকন্দ ইত্যাদি। দামেও রয়েছে বিস্তর ফারাক, যা ১৫ টাকা থেকে শুরু করে ১,৪৬৭ টাকা পর্যন্ত। সবচেয়ে বেশি দামের পণ্যগুলি মূলত Amazon-এ পাওয়া যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, এই পণ্যগুলির ৬২.৩ % কোনো না কোনো সার্টিফিকেশন বা গুণগত মান যাচাইয়ের দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: International Organization for Standardization (২৩.৪%), Ayurveda, Yoga and Naturopathy, Unani, Siddha, and Homoeopathy (২০.৩%), Good Manufacturing Practice (১৫.২%), এবং Food Safety and Standards Authority of India (১৩.২%)। কিন্তু এই সব সার্টিফিকেশনের আড়ালে যে পণ্যগুলির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই, সেটাই গবেষণার মূল ফসল।
এইসব দ্রব্যের অবাধ বিক্রি বন্ধ করতে কঠোর নজরদারি, সত্যতা যাচাই এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন আইন চালু করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন ডঃ প্রশান্ত কুমার সিং। কারণ এই অনিয়ন্ত্রিত বাজার শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, দেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির জন্যও এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।