ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যখন গোটা বিশ্ব উত্তপ্ত, তখন শান্তি স্থাপনের এক নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ভারতের নাম। সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলাস্কায় অনুষ্ঠিত তাঁর গোপন বৈঠকের খুঁটিনাটি জানিয়েছেন। এই ঘটনা একদিকে যেমন ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণ করে, তেমনি ইউক্রেন সংকটে ভারতের নিরপেক্ষ অথচ দায়িত্বশীল ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে।
পুতিন-এর ফোন কলটি ছিল অপ্রত্যাশিত। মোদিকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে জানান, আলাস্কায় ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কী কী বিষয়ে কথা হয়েছে। ইউক্রেনের সাথে চলতে থাকা যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য ট্রাম্প এবং তিনি কী কী সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা করেছেন, সে ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য দেন পুতিন। এই পদক্ষেপটি কূটনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, রাশিয়া এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতের মতামতকে কতটা গুরুত্ব দেয়।
ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী মোদি বরাবরের মতো ভারতের অবস্থান জানিয়ে দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারত সবসময়ই এই যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে এবং এই লক্ষ্যে যে কোনো কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে পূর্ণ সমর্থন জানায়। মোদি তাঁর X হ্যান্ডেলে একটি পোস্টে পুতিন-কে ধন্যবাদ জানিয়ে লিখেছেন, “আমার বন্ধু, প্রেসিডেন্ট পুতিন-কে ধন্যবাদ জানাই ফোন করার জন্য এবং আলাস্কায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক বৈঠকের বিষয়ে মতামত ভাগ করে নেওয়ার জন্য।” তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে এই ধরনের মতবিনিময় অব্যাহত থাকবে।
এর আগে ভারত আলাস্কায় ট্রাম্প ও পুতিন-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত এই শীর্ষ সম্মেলনকে স্বাগত জানিয়েছিল। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (MEA) এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দুই নেতার নেতৃত্ব প্রশংসার যোগ্য। তাদের মতে, একমাত্র আলোচনা এবং কূটনীতির মাধ্যমেই এই যুদ্ধের অবসান সম্ভব। বিশ্বের প্রায় সব দেশই ইউক্রেন সংকটের দ্রুত অবসান চাইছে, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে ভয়াবহ দুর্ভোগ নিয়ে এসেছে।
আলাস্কার এই বৈঠকটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম সময়ের ছিল। প্রায় সাত ঘণ্টার বদলে মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যেই বৈঠক শেষ হয়ে যায়। বৈঠক শেষে ট্রাম্প এবং পুতিন দুজনেই সাংবাদিকদের সামনে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন, তবে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।
পুতিন তাঁর বক্তব্যে শান্তির পক্ষে কথা বলেন, তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করে দেন যে, কোনো স্থায়ী সমাধানের জন্য যুদ্ধের মূল কারণগুলো নির্মূল করা জরুরি। তিনি ইউক্রেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সতর্ক করে বলেন, যদি কোনো ধরনের উস্কানি বা গোপন চুক্তি করে এই শান্তি প্রক্রিয়াকে বানচাল করার চেষ্টা করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
অন্যদিকে, ট্রাম্প এই বৈঠককে “সফল” বলে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, বহু বিষয়েই তারা একমত হতে পেরেছেন এবং যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন যে, এখনও অনেক বড় বড় জটিলতা রয়ে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত চুক্তি হওয়া নির্ভর করছে পুতিন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি-এর পারস্পরিক সম্মতির ওপর। তিনি বলেন, “যতক্ষণ না চুক্তি হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো চুক্তি নেই।”
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রধানমন্ত্রী মোদি সম্প্রতি ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি-র শুভেচ্ছার জবাব দিয়েছেন এবং ইউক্রেনের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেছেন। ভারত শুরু থেকেই এই যুদ্ধের সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। মস্কো, ওয়াশিংটন এবং কিভের সঙ্গে ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখে ভারত এই তীব্র পরিস্থিতি বন্ধের একটি গঠনমূলক ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে।
আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রী মোদি-র আমন্ত্রণে পুতিন 23rd India-Russia Annual Summit-এ যোগ দিতে ভারতে আসছেন। এটি ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের গভীরতা এবং এর কৌশলগত গুরুত্বের আরও একটি প্রমাণ। যুদ্ধের বাইরেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক এবং কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে, যা এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করছে।