ভারতীয় নৌবাহিনীর ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচিত হলো। দেশের প্রথম সম্পূর্ণ স্বদেশে নির্মিত ডাইভিং সাপোর্ট ভেসেল (DSV) ‘নিস্তার’ ৮ জুলাই এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বিশাখাপত্তনম-এ। এই অত্যাধুনিক জাহাজটি নির্মাণ করেছে দেশের গর্ব হিন্দুস্তান শিপইয়ার্ড লিমিটেড (HSL) — যা ভারতের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ এবং ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের এক অনন্য সাফল্যের প্রতীক।
‘নিস্তার’ – প্রযুক্তির নিখুঁত সংমিশ্রণ
১১৮ মিটার দৈর্ঘ্যের এবং প্রায় ১০,০০০ টন ওজনের এই বিশাল জাহাজটিতে রয়েছে আধুনিক উদ্ধার প্রযুক্তি। এটি সমুদ্রের ৩০০ মিটার গভীরতায় ডুবুরি অভিযান চালাতে সক্ষম। আরও রয়েছে Remote Operated Vehicle (ROV), যা প্রয়োজনে ১,০০০ মিটার গভীরতায় গিয়ে উদ্ধার ও নজরদারি করতে পারে। এতে সাবমেরিন রেসকিউ, গভীর সমুদ্রে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই নৌবাহিনীর ক্ষমতা বহুগুণে বাড়বে।
স্বনির্ভরতার পথে নিস্তার এক মাইলফলক
২০১৮ সালে ₹২,০১৯ কোটি টাকার চুক্তিতে HSL এই জাহাজ নির্মাণের কাজ শুরু করে। কোভিডের কারণে কিছুটা দেরি হলেও, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর-এ জাহাজটি জলে নামানো হয় এবং ২০২৫ সালের মার্চ–এপ্রিল মাসে সফলভাবে চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। প্রতিটি ধাপে নিস্তার তার অত্যাধুনিক ডাইভিং সাপোর্ট ও উদ্ধার প্রযুক্তির দক্ষতা প্রমাণ করেছে।
উদ্ধার মিশনে নতুন ভরসা
২০১৭ সালে আর্জেন্টিনার ARA San Juan সাবমেরিন দুর্ঘটনা গোটা বিশ্বে গভীর সমুদ্র উদ্ধার প্রযুক্তির অভাব স্পষ্ট করেছিল। নিস্তার সেই অভাব পূরণে ভারতের মাথা উঁচু করেছে। এখন থেকে ভারতীয় নৌবাহিনী যেকোনো সাবমেরিন দুর্ঘটনা বা সমুদ্রসংকটে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে।
আসছে ‘নিপুণ’ও
নিস্তার-এর পরে নির্মাণাধীন আছে আরেকটি DSV, যার নাম ‘নিপুণ’। এই জাহাজও হবে সমান প্রযুক্তিসম্পন্ন ও দক্ষ। এই জোড়া জাহাজ ভারতীয় সাবমেরিন বহরের নিরাপত্তা ও উদ্ধার ব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
HSL-এর সাফল্য এবং ভারতের অগ্রগতি
HSL, এর আগেও INS Dhruv সফলভাবে তৈরি করে চমক দেখিয়েছিল। এবার ‘নিস্তার’ নির্মাণের মাধ্যমে তারা আরও একবার প্রমাণ করল যে ভারতীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্প বিশ্বমানের। এই সাফল্য ‘Make in India’ নীতির বাস্তব রূপ।
‘নিস্তার’ শুধু একটি যুদ্ধজাহাজ নয় — এটি ভারতের প্রযুক্তি, আত্মনির্ভরতা এবং সমুদ্রে স্ট্র্যাটেজিক উপস্থিতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন। ভারতের প্রতিরক্ষা জগতে এই জাহাজের সংযোজন এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। আর যখন ‘নিপুণ’ যুক্ত হবে, তখন ভারতীয় নৌবাহিনী হয়ে উঠবে আরও বেশি সক্ষম, নির্ভরযোগ্য ও আত্মবিশ্বাসী।
ভারত এখন আর কেবল সমুদ্রপথের যাত্রী নয়, বরং এক বলিষ্ঠ নাবিক – যিনি নিজের পথে নিজেই দিশা দেখাতে সক্ষম।