ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের সামুদ্রিক ক্ষমতাকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে চলেছে। এক অত্যাধুনিক ‘স্টেলথ’ পারমাণবিক আক্রমণকারী সাবমেরিন রাশিয়া থেকে লিজ নেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। এটিকে শুধুমাত্র একটি নতুন অস্ত্র হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা, বরং চিন-এর ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক প্রভাবের বিরুদ্ধে ভারতের একটি শক্তিশালী জবাব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই সাবমেরিনটির নাম কে-৫১৯ ‘ইরিবিস‘, যা রাশিয়ার আকুলা-শ্রেণির একটি উন্নত সংস্করণ। এটি ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে এলে, তারা দক্ষিণ চিন সাগর পর্যন্ত তাদের ক্ষমতা বিস্তার করবে। এই পদক্ষেপ ভারত-রাশিয়ার বহুদিনের বন্ধুত্বের ঐতিহ্যকে আরও একবার নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।
কেন এই সাবমেরিন এত জরুরি?
ভারতের সমুদ্র শক্তি বেশ মজবুত হলেও, পারমাণবিক চালিত আক্রমণকারী সাবমেরিন (SSN)-এর অভাব ছিল একটি বড় দুর্বলতা। এই সুযোগ নিয়ে চিন তাদের উন্নত টাইপ-০৯৩বি শাং-শ্রেণি এবং টাইপ-০৯৪এ জিন-শ্রেণির সাবমেরিন ব্যবহার করে ভারত মহাসাগরে নিঃশব্দে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। এই সাবমেরিনগুলিতে রয়েছে ১,৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ওয়াইজে-১৮ অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল, যা বঙ্গোপসাগর এবং আরব সাগরে চিনের নজরদারি বাড়াতে সাহায্য করছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানও তাদের নৌবাহিনীকে আধুনিকীকরণ করছে, যা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ।
এই পরিস্থিতিতে ‘ইরিবিস‘ এসে সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ করবে।
‘ইরিবিস‘-এর অত্যাধুনিক ক্ষমতা
এই সাবমেরিনটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৯৪ সালে রাশিয়ার আমুর শিপইয়ার্ডে, কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তা মাঝপথে থেমে যায়। এখন সেটিকে আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে সম্পূর্ণ করে তোলা হচ্ছে। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলি সত্যিই তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো:
- গভীরতা এবং গতি: এটি ৬০০ মিটারেরও বেশি গভীরে যেতে পারে এবং ৩০ নটের বেশি গতিতে চলতে সক্ষম।
- বিধ্বংসী অস্ত্রশস্ত্র: এতে ছয়টি ৫৩৩ মিমি টর্পেডো টিউব রয়েছে, যেখান থেকে ভারী টর্পেডো এবং ক্রুজ মিসাইল ছোঁড়া যায়। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সমুদ্র এবং স্থলের লক্ষ্যবস্তুতে ১,৫০০ কিলোমিটার দূর থেকে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে।
- স্টেলথ প্রযুক্তি: এই সাবমেরিনটি এতটাই নিঃশব্দ যে শত্রুপক্ষের সিস্টেমও একে সহজে ধরতে পারবে না। এতে উন্নত সোনার অ্যারে, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য বিশেষ সফটওয়্যার যোগ করা হচ্ছে। এটি আমাদের পি-৮আই বিমান এবং দেশীয় অ্যান্টি-সাবমেরিন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গেও সহজে কাজ করতে পারবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সাবমেরিনটি শুধুমাত্র যুদ্ধের জন্য নয়, এটি ভারতের দেশীয় SSN প্রকল্পের জন্য একটি ‘ট্রেনিং প্ল্যাটফর্ম‘ হিসেবেও কাজ করবে। বিশাখাপত্তনমে ডিআরডিও-নেতৃত্বাধীন অ্যাডভান্সড টেকনোলজি ভেসেল প্রকল্পে এর অভিজ্ঞতা ক্রু ট্রেনিং এবং রক্ষণাবেক্ষণে অত্যন্ত সহায়ক হবে।
চুক্তির জটিলতা:
২০১৯ সালে ৩ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তিটি সই হয়। মূলত ২০২৫ সালে এটি ভারতে আসার কথা ছিল। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং কিছু প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে ডেলিভারি এখন অন্তত ২০২৮ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সূত্র মারফত জানা গেছে, রাশিয়ার শিপইয়ার্ডে ভারতীয় দলগুলি সাবমেরিনের প্রাথমিক যাচাইয়ের কাজ শুরু করে দিয়েছে। ভারতে এসে এটি ‘আইএনএস চক্র-৩‘ নামে নৌবাহিনীতে যুক্ত হবে।
এর আগে ২০২১ সালে ‘আইএনএস চক্র-২‘ (যা রাশিয়া থেকে লিজ নেওয়া হয়েছিল) ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই লিজ মডেল ভারতকে পূর্ণাঙ্গ কেনার বিশাল খরচ ছাড়াই পারমাণবিক সাবমেরিন পরিচালনার অভিজ্ঞতা পেতে সাহায্য করে। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রযুক্তি উন্নত হলেও, রোসোবোরোনএক্সপোর্ট-এর মতো রুশ সংস্থাগুলোর সঙ্গে এই সহজলভ্যতা ভারতের কৌশলগত প্রয়োজনের জন্য মূল্যবান।
ভারতের কৌশলগত লাভ:
‘ইরিবিস‘ ভারতে এলে দেশের সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বাড়বে, যা ভারতের বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য। চিনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য এটি একটি ‘স্টপগ্যাপ’ সমাধান—অর্থাৎ, এটি একটি অস্থায়ী কিন্তু কার্যকর বিকল্প। ভারতের নিজস্ব আরিহন্ত-শ্রেণির এসএসবিএন (পারমাণবিক ব্যালিস্টিক সাবমেরিন) প্রকল্প চললেও, বিশেষজ্ঞের অভাব এবং বিলম্বে এটি ক্রু ট্রেনিং, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা দিয়ে সাহায্য করবে, যা ভবিষ্যতে দেশীয় সাবমেরিন তৈরিতে কাজে দেবে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সূত্র বলছেন, “এটি আমাদের নৌবাহিনীকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তিশালী করবে।” নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এই চুক্তি ভারত-রাশিয়া বন্ধুত্বের গভীরতার প্রমাণ। তবে, এটি আমাদের স্বনির্ভরতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারকও—দীর্ঘমেয়াদে নিজেদেরই তৈরি করতে হবে।
‘ইরিবিস‘-এর আগমন ভারতীয় নৌবাহিনীকে আরও দূর-প্রসারী করে তুলবে। এটি কেবল চিন ও পাকিস্তান-এর হুমকি মোকাবিলা করবে না, বরং আমাদের সমুদ্রশক্তিকে বিশ্বমানের করে তুলবে। ভারতের এই স্মার্ট পদক্ষেপ দেখিয়ে দিচ্ছে, আমরা কখনো পিছিয়ে থাকি না।