আজকের বিশ্বে যুদ্ধের চেহারা বদলে গেছে। আর এই পরিবর্তনের পিছনে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্র—সামরিক ড্রোন। এই ড্রোনগুলি কেবল শত্রুর উপর নজর রাখে না, বরং সরাসরি আক্রমণের ক্ষমতাও রাখে। বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলির মধ্যে ভারতও এখন এই প্রযুক্তিতে এগিয়ে চলেছে। চলুন, জেনে নিই কীভাবে ভারত এবং অন্যান্য দেশগুলি তাদের সামরিক ড্রোন দিয়ে বিশ্ব মঞ্চে নিজেদের শক্তি প্রমাণ করছে।
ড্রোন: যুদ্ধের নতুন সৈনিক
আগেকার দিনে যুদ্ধ মানে ছিল বন্দুক, বোমা আর ট্যাঙ্ক। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। ড্রোন এখন যুদ্ধক্ষেত্রে একটি ভয়ঙ্কর অস্ত্র হয়ে উঠেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইরান-ইজরায়েল সংঘাত, সর্বত্রই ড্রোনের ভূমিকা স্পষ্ট। এগুলি শুধু নজরদারি বা গুপ্তচরবৃত্তির জন্য নয়, শত্রুর ওপর সরাসরি হামলার জন্যও ব্যবহৃত হচ্ছে। এই প্রযুক্তির দৌড়ে কোন দেশ কোথায় দাঁড়িয়ে? বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশ এবং তাদের ড্রোন শক্তি দেখে নেওয়া যাক।
বিশ্বের শীর্ষ ড্রোন শক্তি: কার হাতে কী?
১. আমেরিকা:
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ড্রোন রয়েছে আমেরিকার হাতে। তাদের কাছে আছে প্রায় ১৩,০০০ ড্রোন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল MQ-9 Reaper, MQ-1C Gray Eagle, RQ-11 Raven, এবং RQ-4 Global Hawk। এই ড্রোনগুলি নজরদারি, আক্রমণ এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে অত্যন্ত দক্ষ। MQ-9 Reaper এমন একটি ড্রোন যা দূর থেকে শত্রুর ঘাঁটি ধ্বংস করতে পারে। আমেরিকার প্রযুক্তিগত শক্তি তাদের এই ক্ষেত্রে শীর্ষে রেখেছে।
২. তুরস্ক:
তুরস্ক খুব অল্প সময়ে সামরিক ড্রোন প্রযুক্তিতে বিশ্বকে তাক লাগিয়েছে। তাদের Bayraktar TB2 ড্রোন এখন আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ জনপ্রিয়। এই ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর ট্যাঙ্ক এবং সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করতে সক্ষম। তুরস্কর স্বনির্ভর প্রযুক্তি তাদের দ্বিতীয় স্থানে নিয়ে গেছে।
৩. পোল্যান্ড:
পোল্যান্ড এর হাতে রয়েছে প্রায় ১,০০০ সামরিক ড্রোন। তাদের Warmate নামের আত্মঘাতী ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর ভূমিকা পালন করে। এছাড়া Orlik এবং Orbiter ড্রোন নজরদারির জন্য ব্যবহৃত হয়। পোল্যান্ড তাদের সীমান্ত সুরক্ষায় এই ড্রোনগুলিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে।
৪. রাশিয়া:
রাশিয়ার কাছে রয়েছে Orlan-10 এবং Searcher MK II ড্রোন। তারা এখন দূরপাল্লার ড্রোন তৈরিতে বিশেষ জোর দিচ্ছে। এই ড্রোনগুলি নজরদারি এবং আক্রমণে দক্ষ। রাশিয়ার লক্ষ্য তাদের প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করা।
৫. জার্মানি:
জার্মানির হাতে রয়েছে প্রায় ৬৭০টি ড্রোন, যা মূলত নজরদারি এবং সীমিত আক্রমণে ব্যবহৃত হয়। আন্তর্জাতিক সামরিক মিশনেও এই ড্রোনগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৬. ভারত:
ভারত এখন সামরিক ড্রোন প্রযুক্তিতে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। দেশের হাতে রয়েছে প্রায় ৬২৫টি ড্রোন, যার মধ্যে রয়েছে ইসরায়েল থেকে আমদানি করা Heron-1 এবং Spylite। তবে ভারত এখন নিজস্ব প্রযুক্তিতে ড্রোন তৈরির দিকে জোর দিচ্ছে। DRDO এবং অন্যান্য সংস্থা দেশীয় ড্রোন তৈরিতে কাজ করছে, যাতে বিদেশি নির্ভরতা কমানো যায়।
৭. ফ্রান্স:
ফ্রান্স এর কাছে রয়েছে ৫৯১টি সামরিক ড্রোন। তাদের Thales Spy Ranger, Safran Patroller, এবং MQ-9 Reaper ড্রোনগুলি যুদ্ধক্ষেত্রে বিশেষ শক্তি যোগ করেছে। ফ্রান্স তাদের ড্রোন প্রযুক্তিকে ক্রমাগত উন্নত করছে।
৮. অস্ট্রেলিয়া:
অস্ট্রেলিয়ার হাতে রয়েছে ৫৫৭টি ড্রোন, যার মধ্যে রয়েছে ছোট PD-100 Black Hornet থেকে বড় MQ-9 Reaper। এই ড্রোনগুলি নিরাপত্তা এবং নজরদারিতে ব্যবহৃত হয়।
৯. দক্ষিণ কোরিয়া:
দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে রয়েছে ৫১৮টি ড্রোন, যা সীমান্ত নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা কাজে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে অনেক ড্রোন দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি, যা তাদের শক্তিকে আরও বাড়িয়েছে।
১০. ফিনল্যান্ড:
ফিনল্যান্ড এর হাতে রয়েছে ৪১২টি ড্রোন, যার মধ্যে Orbiter 2-B এবং Ranger ড্রোন উল্লেখযোগ্য। এগুলি মূলত সীমান্ত সুরক্ষা এবং নজরদারিতে ব্যবহৃত হয়।
ভারতের ড্রোন শক্তি
ভারত এখন শুধু বিদেশি ড্রোনের ওপর নির্ভর নয়। DRDO এবং অন্যান্য দেশীয় সংস্থাগুলি নিজস্ব ড্রোন প্রযুক্তি তৈরিতে কাজ করছে। Heron-1 এবং Spylite এর মতো ড্রোনগুলি ভারতীয় সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করেছে। এছাড়া, ভারত এখন স্বনির্ভর ড্রোন তৈরির দিকে এগিয়ে চলেছে, যা সীমান্ত নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা কাজে বড় ভূমিকা পালন করবে। এই প্রযুক্তি ভারতকে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলির সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ড্রোন শুধু একটি মেশিন নয়, এটি যুদ্ধের কৌশল বদলে দিয়েছে। এরা দূর থেকে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে, গোপন তথ্য সংগ্রহ করে এবং প্রয়োজনে সরাসরি আক্রমণও করে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান-ইজরায়েল সংঘাত এ ড্রোনের ভয়ঙ্কর ক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছে। এই প্রযুক্তি দেশের নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করে।