ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে কে না ভালোবাসে? আর সেই স্বপ্ন যখন বাস্তবের চেহারা নেয়, তখন তার কদরই আলাদা। এমনই এক অসাধ্য সাধন করে দেখিয়েছেন সুরতের কিছু তরুণ ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র। তাঁরা এমন একটি ইলেকট্রিক বাইক তৈরি করেছেন, যা শুধু পরিবেশবান্ধবই নয়, একই সঙ্গে চালকবিহীন, অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলার ক্ষমতা রাখে! চমকের এখানেই শেষ নয়, বাইকটির চাকা ‘হাবলেস’, যা এটিকে দিয়েছে এক অন্য রকম রূপ।
এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনের পেছনের কারিগর হলেন তৃতীয় বর্ষের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র শিবম মৌর্য, এবং তাঁর দুই সহপাঠী গুরপ্রীত অরোরা ও গণেশ। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল এই অত্যাধুনিক বাইক, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘গরুনা’। নামটি নেওয়া হয়েছে ভগবান বিষ্ণুর বাহন গরুড় থেকে, যা গতি এবং শক্তির প্রতীক।
ঠিক যেন হলিউডের সায়েন্স ফিকশন মুভি!
শিবম মৌর্য জানান, বাইক এবং অটোমোবাইল সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকেই এই প্রজেক্টের জন্ম। তাঁরা এমন একটি বাইক তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা আগামী ১০-১৫ বছরের প্রযুক্তিগত চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এই ভাবনা থেকেই দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে কঠোর পরিশ্রমের পর তাঁরা তৈরি করেছেন এই প্রোটোটাইপ।
এই প্রোটোটাইপটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে মাত্র ১.৮ লক্ষ টাকা। খরচের পরিমাণ কম হয়েছে কারণ, বাইকের বেশিরভাগ যন্ত্রাংশই স্থানীয়ভাবে এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাইকের সামনের টায়ারটি নেওয়া হয়েছে একটি পুরনো হার্লি-ডেভিডসন বাইক থেকে, আর পেছনের টায়ারটি নেওয়া হয়েছে একটি হায়াবুসা বাইক থেকে, যা তাঁরা সুরতের স্ক্র্যাপ মার্কেট থেকে কিনেছেন।
শিবম গর্বের সাথে বলেন, বাইকটির প্রায় ৭০ শতাংশ যন্ত্রাংশ তাঁদের নিজস্ব ওয়ার্কশপে তৈরি করা হয়েছে। বাকি যে অংশগুলি বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে, তার মধ্যে আছে চাকা, অ্যালয় হুইল, ইলেকট্রিক মোটর এবং কন্ট্রোলার।
‘গরুনা’র বিশেষত্ব কী?
এই বাইকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর হাবলেস চাকা, যা দেখতে খুবই অভিনব এবং অত্যাধুনিক। বাইকের ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যে এটি রাস্তায় চললে পথচারীরা থমকে দাঁড়ায়, সেলফি বা ছবি তোলে। সাধারণ বাইকের তুলনায় এর সিটিং পজিশনও ভিন্ন এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এটি চলার সময় প্রায় কোনো শব্দই করে না।
‘গরুনা’ শুধু দেখতেই সুন্দর নয়, এটি প্রযুক্তির দিক থেকেও অনেক এগিয়ে। বাইকটিতে লাগানো হয়েছে চারটি ক্যামেরা এবং একাধিক সেন্সর, যা বাইকের চারপাশের পরিবেশ নিরন্তর পর্যবেক্ষণ করে।
তিনটি রাইডিং মোড এবং স্মার্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা
‘গরুনা’ তিনটি ভিন্ন মোডে চালানো যায়:
১. ম্যানুয়াল: সাধারণ বাইকের মতোই হাতে নিয়ন্ত্রণ করে চালানো যায়।
২. রিমোট: একটি রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার করে দূর থেকে বাইকটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
৩. অটোনোমাস: এই মোডটি সবচেয়ে আকর্ষণীয়, কারণ এতে কোনো চালক বা রিমোট ছাড়াই বাইকটি নিজে থেকেই চলে।
নিরাপত্তার ব্যাপারেও ‘গরুনা’ অত্যন্ত সচেতন। অটোনোমাস মোডে বাইকটি চলার সময় যদি ১২ ফুটের মধ্যে কোনো মানুষ বা বস্তু চলে আসে, তাহলে সেন্সরগুলি তা শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাইকের গতি কমিয়ে দেয়। আর যদি সেই দূরত্ব ৩ ফুটের মধ্যে চলে আসে, তাহলে বাইকটি নিজে থেকেই ব্রেক কষে সম্পূর্ণ থেমে যায়।
বাইকটিতে রয়েছে একটি ফিক্সড লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, যার ক্ষমতা ৮০ aH। ব্যাটারিটি তিনটি স্তরে সাজিয়ে বাইকের ফ্রেমের মাঝখানে চাকার ভিতরে স্থাপন করা হয়েছে। সাধারণ বৈদ্যুতিক সকেটে বাইকটি চার্জ করা যায়। ফাস্ট চার্জিংয়ের মাধ্যমে মাত্র ২ ঘণ্টায় এটি সম্পূর্ণ চার্জ হয়, আর সাধারণ চার্জিংয়ে সময় লাগে ৪-৫ ঘণ্টা।
ক্ষমতা এবং গতি
‘গরুনা’ দুটি ভিন্ন রাইডিং মোডে চলতে পারে:
১. ইকো মোড: এই মোডে এটি শহরের রাস্তায় এক চার্জে ২০০-২২০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে।
২. স্পোর্ট মোড: এই মোডে এটি ১৫০-১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে, কারণ এই মোডে বাইকটি বেশি শক্তি ব্যবহার করে।
বর্তমানে এই প্রোটোটাইপটি কিছু রাস্তায় পরীক্ষা করা হয়েছে এবং এটি ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম। এই তরুণ ছাত্ররা ভবিষ্যতে একটি হাই-ক্যাপাসিটি ইলেকট্রিক মোটর লাগিয়ে বাইকের গতি ঘণ্টায় ১০০-১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।
শিবম এবং তাঁর দলের এই অসাধারণ সৃষ্টি ইতিমধ্যেই সকলের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এটি শুধু একটি বাইক নয়, এটি ভারতের তরুণ প্রজন্মের প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।