ভারতের ঘন জঙ্গল আর তার বুক চিরে চলে যাওয়া রেললাইন—দৃশ্যটি রোমাঞ্চকর হলেও তা প্রায়শই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকে। ট্রেনের ধাক্কায় হাতির মৃত্যু আমাদের মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। কিন্তু এই করুণ দৃশ্য আর হয়তো দেখতে হবে না! Indian Railways (ভারতীয় রেলওয়ে) এবার নিয়ে এসেছে এক যুগান্তকারী সমাধান। রেলের চাকায় পিষ্ট হয়ে হাতির মৃত্যু আটকাতে তারা ব্যবহার করতে চলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর জাদু। রেলওয়ে চালু করেছে একটি অত্যাধুনিক AI-based Intrusion Detection System (IDS), যা হাতিদের ট্রেনের লাইনে আসার আগেই সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেবে।
কীভাবে কাজ করবে এই ‘অদৃশ্য রক্ষক’?
এই প্রযুক্তিটি শুনতে জটিল মনে হলেও এর কাজ করার পদ্ধতি বেশ চমকপ্রদ। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি কাজ করে শব্দের কম্পন বা ভাইব্রেশন ধরে। রেললাইন বরাবর অপটিক্যাল ফাইবার পাতা থাকে, যা Distributed Acoustic System (DAS) প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজ করে।
যখনই কোনো হাতি রেললাইনের আশেপাশে চলে আসে বা হাঁটাচলা করে, তার পায়ের ভারে মাটিতে যে কম্পন সৃষ্টি হয়, এই সিস্টেমটি তা নিখুঁতভাবে ধরে ফেলে। হাতি লাইনে ওঠার অনেক আগেই এই সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে Loco Pilot (ট্রেন চালক), Station Master এবং Control Room-এ অ্যালার্ম বা সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেয়। ফলে চালক অনেক আগেই ট্রেনের গতি কমিয়ে বা ট্রেন থামিয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে পারেন। ভাবুন তো, দ্রুতগামী ট্রেন আর বিশালকায় হাতির মাঝখানে এই প্রযুক্তি যেন এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে!
কোথায় কোথায় চালু হচ্ছে এই প্রযুক্তি?
প্রাথমিকভাবে এই সিস্টেমটি North East Frontier Railway (NF Railway)-এর অন্তর্গত 141 km দীর্ঘ রেলপথে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছিল এবং তা দারুণ সফল হয়েছে। এই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে রেলওয়ে এবার আরও বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে। নতুন করে আরও 981 km রেলপথের জন্য টেন্ডার ডাকা হয়েছে, যেখানে হাতির আনাগোনা বেশি। রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব স্বয়ং রাজ্যসভা-য় দাঁড়িয়ে এই সুখবর জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই এআই-ভিত্তিক পদক্ষেপ রেলের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি বন্যপ্রাণ রক্ষায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
শুধু হাতি নয়, রেল এখন আরও ‘স্মার্ট’
রেলওয়ের এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব শুধু হাতি বাঁচানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। রেলকে আরও নিরাপদ ও দক্ষ করতে AI-এর ব্যবহার নানাভাবে বাড়ানো হচ্ছে:
- সিগন্যালিং ব্যবস্থা: সিগন্যাল খারাপ হওয়ার আগেই যাতে বোঝা যায়, তার জন্য বিভিন্ন স্টেশনে ‘প্রেডিকটিভ মেইনটেন্যান্স’-এর পাইলট প্রজেক্ট চলছে।
- ট্রেনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা: ট্রেনের চাকা, বিয়ারিং বা অন্যান্য যন্ত্রাংশ ঠিক আছে কি না, তা দেখার জন্য চালু হয়েছে OMRS (On-board Monitoring of Rolling Stock) এবং WILD (Wheel Impact Load Detector) সিস্টেম।
- চলন্ত ট্রেনের নজরদারি: গত July মাসে Dedicated Freight Corridor Corporation-এর সঙ্গে একটি বিশেষ মউ (MoU) সাক্ষরিত হয়েছে। এর আওতায় আনা হচ্ছে MVIS (Machine Vision Inspection System), যা চলন্ত ট্রেনের কোনো অংশ ঝুলে আছে কি না বা কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না, তা স্ক্যান করে ধরে ফেলবে।
- মেট্রো প্রযুক্তি: এমনকি Delhi Metro-র সাথেও হাত মিলিয়ে ট্রেনের চাকার প্রোফাইল বা মাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতীয় রেল এখন আর সেই পুরনো ধাঁচে নেই, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তারা হয়ে উঠছে সত্যিকারের ‘স্মার্ট রেলওয়ে’। হাতির মতো নিরীহ প্রাণীর জীবন বাঁচাতে এবং যাত্রীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।