আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ে বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বে তুমুল আলোচনা চলছে। প্রযুক্তি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবন, সবখানেই এর প্রভাব স্পষ্ট। কিন্তু এই লাগামহীন উন্নতির মধ্যে এবার সামনে এল এক চাঞ্চল্যকর সতর্কবার্তা। AI জগতের অন্যতম সেরা ব্যক্তিত্ব এবং ‘AI-এর গডফাদার‘ হিসেবে পরিচিত বিজ্ঞানী জিওফ্রে হিন্টন সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর উপর কড়া ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সংস্থাগুলো কেবল দ্রুত লাভের আশায় এমন কিছু ভুল করছে, যা মানবজাতির জন্য চরম বিপজ্জনক হতে পারে। এই খবরটি প্রকাশিত হতেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রতিযোগিতায় মত্ত সংস্থা, ঘনিয়ে আসছে AI-এর বিপদ!
হিন্টন বলেন, প্রযুক্তি সংস্থাগুলো এখন একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। কে আগে আরও শক্তিশালী এবং উন্নত AI মডেল তৈরি করতে পারে, সেই দিকেই তাদের সমস্ত মনোযোগ। কিন্তু এই উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় তারা ভুলে যাচ্ছে এর দীর্ঘমেয়াদী এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, AI যদি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে তা বিপর্যয় ডেকে আনবে।
তিনি আরও বলেন, AI-এর আসল বিপদ চাকরি হারানো বা ভুল তথ্য ছড়ানো নয়। বরং, আসল বিপদ হলো AI মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হয়ে ওঠার পর একে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। হিন্টনের মতে, এই ধরনের লাগামহীন উন্নতির দিকে ছুটে চলা প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর সবচেয়ে বড় ভুল হলো নৈতিকতার অভাব। তারা কোটি কোটি টাকা খরচ করছে AI উন্নয়নের পেছনে, কিন্তু এর থেকে যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে তারা একেবারেই ভাবছে না। তিনি বলেন, “আমরা প্রস্তুত নই, এবং চেষ্টাও করছি না।”
পারমাণবিক অস্ত্রের মতো AI, দরকার আন্তর্জাতিক চুক্তি
এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য হিন্টন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, AIকে পারমাণবিক অস্ত্রের মতোই দেখা উচিত। যেভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চুক্তি, নজরদারি এবং কিছু নির্দিষ্ট নীতি অনুসরণ করা হয়, AI-এর ক্ষেত্রেও একই রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। হিন্টনের মতে, বিশ্বের সব দেশকে একত্রিত হয়ে এই বিষয় নিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ধীরে ধীরে AI-এর অগ্রগতি করা উচিত, কারণ মানুষেরা এখনও এর প্রভাব বুঝতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রস্তুত নয়। গবেষক, নিয়ন্ত্রক এবং প্রযুক্তি সংস্থাদের এখন নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির কথা ভেবে কাজ করতে হবে।
‘AI সাইকোসিস’ এবং ভবিষ্যতের চিন্তা
AI নিয়ে এমন আশঙ্কার মধ্যেই আরও একটি নতুন ধারণা সামনে এসেছে। মাইক্রোসফটের AI সিইও মুস্তফা সুলেমান সম্প্রতি ‘AI সাইকোসিস’ নামে একটি সমস্যার কথা বলেছেন। এই সমস্যায় মানুষ AI-এর সঙ্গে অতিরিক্ত কথা বলে বাস্তব জীবন থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এটি বিশেষ করে সেইসব মানুষের জন্য বিপদজনক, যারা মানসিকভাবে দুর্বল।
AI নিঃসন্দেহে আমাদের জীবনকে সহজ করছে, কিন্তু হিন্টনের মতো বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কেবল লাভের জন্য মানুষের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ বিসর্জন দেওয়া যাবে না। এখন সময় এসেছে সমস্ত দেশকে একত্রিত হয়ে AI-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর চিন্তা করতে হবে।