ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে চলেছে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর (IAF) শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে আসছে দেশের নিজস্ব তৈরি পঞ্চম জেনারেশনের স্টেলথ ফাইটার জেট—অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট (AMCA)। তবে শুধু শক্তিশালী ইঞ্জিন বা অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতাই নয়, এই বিমানের আসল চমক লুকিয়ে আছে এর ‘মস্তিষ্কে’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI (Artificial Intelligence) দ্বারা চালিত এক অত্যাধুনিক সেলফ-মনিটরিং সিস্টেম এই বিমানকে বিশ্বের অন্যতম সেরা যুদ্ধবিমানে পরিণত করতে চলেছে।
সহজ কথায় বলতে গেলে, এই বিমান নিজের শরীরের খেয়াল নিজেই রাখবে!
‘গেম-চেঞ্জার’ প্রযুক্তি: বিমান যখন নিজেই ডাক্তার
এয়ারোনটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (ADA) দ্বারা ডিজাইন করা AMCA হতে চলেছে ভারতের প্রথম ফাইটার জেট, যাতে একটি সম্পূর্ণ ইন্টিগ্রেটেড ভেহিকল হেলথ ম্যানেজমেন্ট (IVHM) সিস্টেম থাকবে।
এতদিন পুরনো যুদ্ধবিমানগুলো কোনো মিশন বা ‘সর্টি’ শেষ করে ফেরার পর ইঞ্জিনিয়াররা ম্যানুয়ালি পুরো বিমান পরীক্ষা করতেন, যা ছিল সময়সাপেক্ষ। কিন্তু AMCA-র ক্ষেত্রে এই ধারণাই বদলে যাচ্ছে। এই বিমানে জালের মতো ছড়িয়ে থাকবে অসংখ্য অত্যাধুনিক সেন্সর। বিমান যখন আকাশে উড়বে, তখনই এই সেন্সরগুলো রিয়েল-টাইমে বিমানের প্রতিটি অংশের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে থাকবে।
সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কোনো বড় সমস্যা হওয়ার আগেই এই সিস্টেম তা ধরে ফেলবে। পাইলট মাটিতে ল্যান্ড করার আগেই গ্রাউন্ডে থাকা টেকনিশিয়ানদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে যে বিমানের ঠিক কোন অংশে মেরামতের প্রয়োজন। একে বলা হচ্ছে ‘প্রেডিক্টিভ মেনটেন্যান্স’। অর্থাৎ, রোগ হওয়ার আগেই চিকিৎসার ব্যবস্থা!
AI এবং ডিজিটাল টুইনের জাদু
এই পুরো সিস্টেমের কেন্দ্রে রয়েছে অ্যাডভান্সড AI। বিমানের ইঞ্জিন, অ্যাভিয়নিক্স এবং এয়ারফ্রেম থেকে আসা বিপুল পরিমাণ ডেটা এই AI বিশ্লেষণ করবে। অনেকটা আমেরিকার অত্যাধুনিক F-35 ফাইটার জেটের মতো, এই সিস্টেম আগে থেকেই বলে দেবে কোনো যন্ত্রাংশ কখন বদলানো দরকার।
এখানেই শেষ নয়, AMCA-তে ব্যবহার করা হচ্ছে চমকপ্রদ ‘ডিজিটাল টুইন’ টেকনোলজি। অর্থাৎ, কম্পিউটারের ভেতরে আসল বিমানের একটি হুবহু ভার্চুয়াল কপি বা যমজ থাকবে। ইঞ্জিনিয়াররা এই ভার্চুয়াল মডেলে বিভিন্ন সমস্যা সিমুলেট করে দেখতে পারবেন এবং মেরামতের সেরা উপায়টি খুঁজে বের করতে পারবেন, যা আসল বিমানে প্রয়োগ করা হবে।
এছাড়াও, টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষণের জন্য অগমেন্টেড রিয়ালিটি (AR) এবং AI-যুক্ত মডিউল ব্যবহার করা হবে, যাতে তারা স্টেলথ সিস্টেমের মতো জটিল প্রযুক্তি সহজেই সামলাতে পারেন।
লক্ষ্য: ৭৫% ফ্লিট সর্বদা প্রস্তুত
ভারতীয় বিমান বাহিনীর পুরনো বিমানগুলোতে প্রায়শই লম্বা মেরামতির সময় এবং স্পেয়ার পার্টসের অভাবে অনেক বিমান মাটিতে বসে থাকত। কিন্তু AMCA-র এই হাই-টেক ব্যবস্থার ফলে এই সমস্যার দিন শেষ হতে চলেছে।
এই নতুন প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো, যুদ্ধের সময় বা যেকোনো প্রয়োজনে AMCA ফ্লিটের অন্তত ৭৫ শতাংশ (75%) বিমান যেন সবসময় ওড়ার জন্য প্রস্তুত থাকে। আধুনিক বিমান বাহিনীর জন্য এটি একটি ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’। এর ফলে যুদ্ধের সময় দীর্ঘক্ষণ অপারেশন চালানো সম্ভব হবে এবং বিমানের রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ও লজিস্টিক্যাল ঝামেলা অনেকটাই কমে যাবে।
কবে আসছে এই স্বপ্নের বিমান?
এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি (CCS) থেকে সবুজ সংকেত পেয়েছে এবং এর জন্য ১৫,০০০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, AMCA-র প্রথম প্রোটোটাইপটি ২০২৮-২৯ সালের দিকে প্রকাশ্যে আসবে এবং ২০৩৪-৩৫ সালের মধ্যে এটি ভারতীয় বিমান বাহিনীতে পুরোপুরিভাবে যুক্ত হবে।
AMCA শুধু একটি যুদ্ধবিমান নয়, এটি ভারতের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এই ধরনের উদ্ভাবন প্রমাণ করে যে, ভারত খুব দ্রুত বিশ্বের প্রতিরক্ষা মানচিত্রে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে চলেছে।