এশিয়ার আকাশপথের সামরিক প্রতিযোগিতায় এলো এক নতুন মোড়। সিনেমার গল্পকেও হার মানাবে এই ঘটনা। গত মাসে রাজস্থানের মাটিতে পাকিস্তানের ছোড়া চিনের অত্যাধুনিক মিসাইল ‘পিএল-১৫ই‘ অক্ষত অবস্থায় ভারতের হাতে আসার পর প্রতিরক্ষা গবেষণায় কার্যত বিপ্লব ঘটে গেছে। ভারতের বিজ্ঞানীরা সেই মিসাইলের গোপনীয়তা ভেদ করে তার দুর্বলতা ফাঁস করে দিতেই, চিন এখন তড়িঘড়ি করে নতুন মিসাইল ‘পিএল-১৬‘ তৈরিতে গতি বাড়িয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ভারতের জন্য গত কয়েক দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লাভ, যা ভারতকে চিনের সঙ্গে সামরিক প্রযুক্তির দূরত্ব কমাতে সাহায্য করবে।
কী হয়েছিল ‘অপারেশন সিন্দুর’-এ?
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘অপারেশন সিন্দুর’। গত মাসে নিয়মিত মহড়ার সময় পাকিস্তানি বিমান থেকে ছোড়া একটি পিএল-১৫ই (PL-15E) মিসাইল লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে রাজস্থানের এক শুষ্ক অঞ্চলে পড়ে যায়—এবং অবিশ্বাস্যভাবে তা প্রায় সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার হয়।
ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (DRDO) এবং ভারতীয় বিমানবাহিনীর (IAF) বিশেষজ্ঞরা তৎক্ষণাৎ তা তুলে নেন এবং শুরু করেন গভীর বিশ্লেষণ। এই মিসাইলটি চিনের উন্নত প্রযুক্তির এক নমুনা, যা ডুয়াল-পালস রকেট মোটর, একটি সক্রিয় রাডার সিকার এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার (EW) প্রতিরোধের মতো জটিল সিস্টেমে তৈরি। এর যেতে পারে প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার, গতি ম্যাক ৫-এরও বেশি, এবং এটি বিমান থেকে বিমানে আক্রমণের জন্য তৈরি এক মারাত্মক অস্ত্র।
কিন্তু ভারতীয় বিশ্লেষণে বেরিয়ে আসে এর আসল দুর্বলতা: রাডার সিগন্যালের এনকোডিং এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের বিরুদ্ধে কিছু সূক্ষ্ম ফাঁক বা “গ্যাপ”। শত্রুর হাতে থাকা অস্ত্রের গোপন রহস্য জেনে যাওয়ার এই ঘটনা ভারতের প্রতিরক্ষা মহলে আনন্দের ঢেউ এনেছে।
ভারতের Astra মিসাইল এখন আরও ধারালো
চিনের পিএল-১৫ই থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভারত এখন তার নিজস্ব ‘Astra‘ মিসাইল পরিবারকে আরও শক্তিশালী করতে শুরু করেছে।
- বর্তমানে তৈরি হচ্ছে Astra Mk-2, যার পরিসর প্রায় ১৫০ কিলোমিটার। এখন এতে চিনের মিসাইলের দুর্বলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জ্যামিং প্রতিরোধের নতুন প্রযুক্তি এবং উন্নত সিগন্যাল প্রসেসিং যুক্ত করা হচ্ছে।
- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আরও উন্নত Astra Mk-3 তৈরির কাজ দ্রুত এগোচ্ছে, যার পরিসর হবে ৩০০ কিলোমিটার-এরও বেশি। এই নতুন মিসাইল চিনের পিএল-১৫-এর সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দিতে সক্ষম হবে।
এই উন্নয়নগুলি ভারতের দেশীয় ফাইটার জেট তেজাস (Tejas) এবং রুশ-নির্মিত এসইউ-৩০ (Su-30) বিমানগুলোকে আকাশযুদ্ধে এক নতুন ক্ষমতা এনে দেবে।
চুপ করে নেই চিন, আসছে অতি-গোপনীয় PL-১৬!
এই ধাক্কা খেয়ে চিন কি চুপ করে থাকবে? মোটেই না! বেইজিং এখন তাদের পরবর্তী জেনারেশনের মিসাইল ‘পিএল-১৬‘ (PL-16)-এর উন্নয়ন কাজকে জোরদার করেছে।
পিএল-১৬ হলো পিএল-১৫-এর একটি ‘স্টিলথ-অপ্টিমাইজড’ সংস্করণ। এই মিসাইলটি বিশেষ করে চিনের স্টিলথ ফাইটার জেট J-20 এবং আসন্ন ষষ্ঠ জেনারেশনের ফাইটার জেটের Internal Weapons Bay ফিট করার জন্য ডিজাইন করা হচ্ছে।
- এর আকার ছোট করা হচ্ছে এবং এতে যোগ করা হচ্ছে রাডার-শোষণকারী উপাদান।
- পাশাপাশি, এতে উন্নত মিড-কোর্স গাইডেন্স রয়েছে, যা শত্রুর রাডার থেকে লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করবে।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পরিসর ২০০-৩০০ কিলোমিটার বা তার বেশি হতে পারে এবং গতি হবে ম্যাক ৫-এর উপরে।
চিন এখন তাদের প্রযুক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মডুলার ডিজাইন এবং এনক্রিপশনের আপডেট করছে, যাতে ভবিষ্যতে তার দুর্বলতা খুঁজে বের করা সম্ভব না হয়।
এশিয়ার আকাশে প্রযুক্তির নতুন লড়াই
এই ঘটনা কেবল ভারত ও চিনের মধ্যেকার সামরিক প্রতিযোগিতা নয়, এটি এশিয়ার আকাশে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং মিসাইল প্রযুক্তির লড়াইকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল। ভারতের এই ‘অপারেশন সিন্দুর’ দেখিয়ে দিল, শত্রুর সামান্যতম ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া সামরিক গোয়েন্দা তথ্যের ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভারতের প্রতিরক্ষা বিজ্ঞান এখন আর পিছিয়ে নেই—বরং শত্রুর প্রযুক্তিকে বুঝে নিজের প্রযুক্তিকে শাণিত করার এক নতুন পথে হাঁটা শুরু করেছে।