ভবিষ্যতের গাড়ি কেমন হবে? সেই প্রশ্নের এক দারুণ উত্তর নিয়ে হাজির হল প্রযুক্তি সংস্থা Qualcomm এবং গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থা BMW Group। গত তিন বছর ধরে নিরলস গবেষণার পর এই দুই সংস্থা এবার প্রকাশ্যে এনেছে তাদের নতুন স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং সিস্টেম (Automated Driving System), যার নাম Snapdragon Ride Pilot। জার্মানির মিউনিখে আয়োজিত IAA Mobility 2025 শো-তে এই যুগান্তকারী প্রযুক্তির বিশ্বব্যাপী আত্মপ্রকাশ ঘটল BMW iX3 গাড়ির মাধ্যমে।
Snapdragon Ride Pilot হলো একটি অত্যাধুনিক ড্রাইভিং সিস্টেম যা ড্রাইভারকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করে এবং একইসাথে স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং-এর সুবিধা প্রদান করে। এটি তৈরি হয়েছে Qualcomm-এর শক্তিশালী Snapdragon Ride সিস্টেম-অন-চিপস (SoCs) এবং একটি বিশেষ সফ্টওয়্যার স্ট্যাকের উপর ভিত্তি করে, যা Qualcomm ও BMW যৌথভাবে তৈরি করেছে। এর ফলে সাধারণ সুরক্ষার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে লেভেল ২+ হাইওয়ে এবং শহরের রাস্তায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেভিগেট করার মতো উন্নত বৈশিষ্ট্যগুলিও এতে পাওয়া যায়।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর ক্ষমতা। BMW এই নতুন সিস্টেমের সেন্ট্রাল কম্পিউটারকে “সুপারব্রেন অফ অটোমেটেড ড্রাইভিং“ (Superbrain of Automated Driving) বলা হয়েছে। তাদের দাবি, এর কম্পিউটিং ক্ষমতা আগের তুলনায় ২০ গুণ বেশি। এটি হাই-রেজোলিউশনের ক্যামেরা, রাডার সেন্সর, ম্যাপিং এবং GNSS লোকলাইজেশন ব্যবহার করে গাড়ির চারপাশে একটি নির্ভরযোগ্য 355 ডিগ্রি ভিউ তৈরি করে, যা নির্ভুল নেভিগেশন এবং সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়।
Qualcomm এবং BMW জানিয়েছে যে, এই সিস্টেমটি ইতিমধ্যেই ৬০টিরও বেশি দেশে পরীক্ষা করে সাফল্য পেয়েছে এবং ২০২৬ সালের মধ্যে ১০০টিরও বেশি দেশে এটি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু তাই নয়, এই উন্নত প্রযুক্তি অন্যান্য গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থা এবং সাপ্লাইয়ারদের জন্যও খোলা হবে, যা ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং-এর ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
সুরক্ষা এবং কার্যকারিতা:
নিরাপত্তার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এই সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে। এতে NCAP, FMVSS127 এবং DCAS-এর মতো আন্তর্জাতিক সুরক্ষা নিয়মাবলী মেনে চলা হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা এবং ফাংশনাল সেফটির দিকটিও গুরুত্বের সাথে দেখা হয়েছে। এছাড়াও, সিস্টেমটিতে ওভার–দ্য–এয়ার (OTA) আপডেটের সুবিধা আছে, যার ফলে এটি বিশ্বব্যাপী গাড়ি থেকে পাওয়া ডেটার ভিত্তিতে সময়ের সাথে সাথে আরও উন্নত হতে পারবে।
কী কী রয়েছে এই সিস্টেমে?
Snapdragon Ride Pilot মূলত দুটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত:
- একটি হলো Qualcomm দ্বারা তৈরি পারসেপশন স্ট্যাক, যা গাড়ির চারপাশের পরিবেশকে বুঝতে সাহায্য করে।
- অন্যটি হলো BMW-এর সাথে যৌথভাবে তৈরি করা ড্রাইভ পলিসি ইঞ্জিন, যা গাড়ির গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে।
এই সিস্টেমের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো:
- অবজেক্ট ডিটেকশন (সামনে থাকা বস্তু শনাক্তকরণ)
- ট্র্যাফিক সাইন রেকগনিশন (রাস্তার ট্রাফিক চিহ্ন চিহ্নিতকরণ)
- পার্কিং অ্যাসিস্ট্যান্স (পার্কিং-এ সাহায্য)
- লেন রেকগনিশন (লেন চেনা)
- ড্রাইভার মনিটরিং (ড্রাইভারের দিকে নজর রাখা)
এতে রাডার এবং ক্যামেরার মিলিত ইনপুট ব্যবহার করা হয়, যা জটিল পরিস্থিতিতেও গাড়ির সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং ল্যাটেন্সি কমায়।
BMW iX3-এ কী পাওয়া যাবে?
নতুন BMW iX3-এ এই স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং সিস্টেমের সাহায্যে কিছু দারুণ ফিচার পাওয়া যাবে:
- কন্টেক্সচুয়াল লেন চেঞ্জ: চালকের সামান্য ইঙ্গিত, যেমন আয়নার দিকে তাকানো বা স্টিয়ারিং-এ হালকা স্পর্শ, দেখেই গাড়ি নিজে থেকেই লেন পরিবর্তন করতে পারবে।
- হাইওয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট: অনুমোদিত রাস্তায় চালক হাত না লাগিয়েও গাড়ি চালাতে পারবেন।
- AI–পার্কিং অ্যাসিস্ট্যান্স: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এটি পার্কিং-এর ক্ষেত্রে সাহায্য করবে।
এছাড়াও, BMW iX3-তে Qualcomm-এর V2X 200 চিপসেট ব্যবহার করা হয়েছে, যা ভেহিকেল-টু-এভরিথিং কমিউনিকেশন (V2X) সম্ভব করে তোলে। এর ফলে গাড়িটি আশেপাশের অন্যান্য গাড়ি, রাস্তার পরিকাঠামো এবং পথচারীদের সাথে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে, যা চালকের চোখের বাইরে থাকা বিপদও শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
Qualcomm Technologies, Inc.-এর গ্রুপ জিএম, অটোমোটিভ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল সি এমবেডেড আইওটি, নাকুল দুগ্গাল বলেন, “বিশ্বমানের BMW ইঞ্জিনিয়ারিং দলের সাথে আমাদের এই সহযোগিতা সত্যিই অসাধারণ। এর মাধ্যমে আমরা এমন একটি সিস্টেম তৈরি করতে পেরেছি যা এখন সব ধরনের গ্রাহকদের জন্য স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং-এর নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করবে।”
BMW Group-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেভেলপমেন্ট ড্রাইভিং এক্সপেরিয়েন্স, ড. মিহিয়ার আয়োবি বলেন, “স্মার্ট, সিমবায়োটিক এবং নিরাপদ – এটিই হলো ADAS-এর ক্ষেত্রে আমাদের BMW দর্শন। আমাদের নতুন BMW iX3 এই দর্শনকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।”
Qualcomm এবং BMW-এর এই যৌথ উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর লক্ষ্য হলো আগামী বছরগুলোতে আরও বেশি মানুষের কাছে এই উন্নত প্রযুক্তি সহজলভ্য করা, যা আমাদের ভবিষ্যতের যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরও সুরক্ষিত এবং আরামদায়ক করে তুলবে।