তেলুগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বড় ধাক্কা! এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) ২৯ জন বিখ্যাত সেলিব্রিটির বিরুদ্ধে একটি বেআইনি বেটিং অ্যাপ কেলেঙ্কারির মামলা দায়ের করেছে। এই তালিকায় রয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেতা বিজয় দেবেরাকোন্ডা, রানা দাগ্গুবাতি, প্রকাশ রাজ, মঞ্চু লক্ষ্মী, নিধি আগরওয়াল, অনন্যা নাগাল্লা, শ্রীমুখী সহ আরও অনেকে। এই ঘটনা তেলুগু ফিল্ম জগতে বড় আলোড়ন তুলেছে। এই মামলার পিছনে আসল ঘটনা কী?
মামলার সূত্রপাত: হায়দ্রাবাদ সাইবারাবাদ পুলিশ এবং ফণীন্দ্র শর্মা’র অভিযোগ
এই পুরো ঘটনার শুরু গত মার্চ মাসে, যখন হায়দ্রাবাদ সাইবারাবাদ পুলিশ এর কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করেন ফণীন্দ্র শর্মা নামে একজন ব্যবসায়ী। তিনি অভিযোগ করেন যে, বেশ কিছু সেলিব্রিটি এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার বেআইনি বেটিং অ্যাপের প্রচার করছেন। এই অ্যাপগুলো মানুষকে, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের যুবকদের, সহজে টাকা কামানোর লোভ দেখিয়ে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করে। কিন্তু এর ফলে অনেকেই বিপুল পরিমাণ টাকা হারিয়েছেন, যা পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক এবং মানসিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
ফণীন্দ্র শর্মা’র অভিযোগের ভিত্তিতে সাইবারাবাদ পুলিশ একটি এফআইআর(FIR) দায়ের করে। এই এফআইআর-এ বলা হয়েছে যে, এই বেটিং অ্যাপগুলোতে লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেন হয়, যা পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭ এবং প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট (PMLA)-এর অধীনে বেআইনি। এই অভিযোগের পর ED তদন্ত শুরু করে এবং একটি ইনফোর্সমেন্ট কেস ইনফরমেশন রিপোর্ট (ECIR) দায়ের করে।
কী অভিযোগ এই সেলিব্রিটিদের বিরুদ্ধে?
ED’র তদন্তে বলা হয়েছে, এই ২৯ জন সেলিব্রিটি এবং ইনফ্লুয়েন্সার সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বেআইনি বেটিং অ্যাপ প্রচার করেছেন। এই অ্যাপগুলোর মধ্যে রয়েছে A23 Rummy, Junglee Rummy, Yellow 247, FairPlay Live, Jeet Win ইত্যাদি। এই প্রচারের জন্য তারা মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ। ED’র সন্দেহ, এই প্রচারের মাধ্যমে বড় অঙ্কের টাকা মানি লন্ডারিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এই অ্যাপগুলো সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল যুবকদের, দ্রুত টাকা কামানোর প্রলোভন দেখিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে, এই অ্যাপগুলোর প্রভাবে মানুষ আসক্ত হয়ে পড়েছে, যার ফলে তাদের পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে।
কারা কারা আছেন এই তালিকায়?
ED’র তালিকায় রয়েছেন ২৯ জন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, যার মধ্যে আছেন অভিনেতা, টিভি তারকা এবং ইউটিউবার। তালিকাটি হল:
- রানা দাগ্গুবাতি
- প্রকাশ রাজ
- বিজয় দেবেরাকোন্ডা
- মঞ্চু লক্ষ্মী
- প্রণীতা সুভাষ
- নিধি আগরওয়াল
- অনন্যা নাগাল্লা
- শিরি হনুমন্ত
- শ্রীমুখী
- বর্ষিণী সাউন্ডারাজন
- বসন্তি কৃষ্ণন
- শোভা শেট্টি
- অমৃতা চৌধুরী
- নয়নি পবনি
- নেহা পাঠান
- পান্ডু
- পদ্মবতী
- ইমরান খান
- বিষ্ণু প্রিয়া
- হর্ষা সাই
- ভাইয়া সানি ইয়াদব
- শ্যামলা
- টেস্টি তেজা
- রীতু চৌধুরী
- বন্দরু শেষায়নী সুপ্রীতা
- বেটিং প্ল্যাটফর্মের অপারেটর
- কিরণ গৌড়
- অজয়, সানি এবং সুধীর (সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার)
- লোকাল বয় নানি (ইউটিউব চ্যানেল)
এছাড়াও, ED এই বেটিং অ্যাপগুলোর পিছনে থাকা মূল সংগঠকদেরও তদন্তের আওতায় এনেছে।
সেলিব্রিটিদের বক্তব্য
কিছু সেলিব্রিটি ইতিমধ্যেই এই অভিযোগের বিরুদ্ধে তাদের বক্তব্য দিয়েছেন। বিজয় দেবরাকোন্ডা জানিয়েছেন, তিনি শুধুমাত্র A23 নামে একটি দক্ষতা-ভিত্তিক গেমিং প্ল্যাটফর্মের প্রচার করেছেন, যা তিনি দাবি করেছেন বৈধ। তিনি বলেছেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রামি (Rummy) কে দক্ষতা-ভিত্তিক খেলা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা জুয়া নয়।
অন্যদিকে, রানা দাগ্গুবাতি র মুখপাত্র জানিয়েছেন, তিনি ২০১৭ সালে একটি দক্ষতা-ভিত্তিক গেমিং অ্যাপের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন, যা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেছেন, তার প্রচার সম্পূর্ণ বৈধ ছিল।
প্রকাশ রাজ বলেছেন, তিনি ২০১৭ সালে একটি অ্যাপের প্রচারের জন্য চুক্তি করেছিলেন, কিন্তু পরে তা রি-নিউ করেননি কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এটি তার নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মহাদেব অ্যাপ কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পর্ক
এই মামলাটি মহাদেব বেটিং অ্যাপ কেলেঙ্কারির সঙ্গেও যুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। ED এর আগেও এই অ্যাপের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজন সেলিব্রিটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এই অ্যাপটি ভারতের বৃহত্তম অবৈধ বেটিং প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে পরিচিত।
এরপর কী হবে?
ED এখন এই ২৯ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাবে। তাদের নোটিশ পাঠানো হতে পারে এবং তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ট্যাক্স রেকর্ড এবং পেমেন্টের বিষয়ে তদন্ত করা হবে। এই ঘটনা তেলুগু চলচ্চিত্র এবং সোশ্যাল মিডিয়া জগতে বড় ধাক্কা হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
আমাদের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত?
এই ঘটনা আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এবং সেলিব্রিটিদের দায়িত্ব সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করে। অনেক সময়, বিখ্যাত ব্যক্তিদের প্রচার দেখে সাধারণ মানুষ ভুল পথে চলে যায়। তাই, আমাদের সকলের উচিত যাচাই করে কোনো প্ল্যাটফর্মে টাকা বিনিয়োগ করা।